Pages

Wednesday, 30 November 2016

বাথরুম


রিটায়ারমেন্টের পর থেকে বাথরুমে একটু বেশীই সময় কাটান কুঞ্জ বাবু। বিশেষ করে শীতকাল হলে তো কথাই নেই। চা খেয়ে সেই আটটার সময় বাথরুমে ঢুকবেন। তারপর আধ ঘন্টা ধরে বিড়ি খেতে খেতে খকখক করে কেশেই যাবেন। তার সাথে মিনিট পাঁচেক অন্তর অন্তর 'খ্যাক থুঃ খ্যাক থুঃ' বলে কফ ফেলার শব্দ। বাবার এই বদভ্যাসটা  খুবই বিরক্তিকর লাগে সন্দীপের। সে প্রায় ত্রিশ কিমি দূরে একটা সরকারি কলেজে ইংরেজি সাহিত্য পড়ায়। বাইক নিয়েই যাওয়া আসা করে যদিও‚ তবু পৌঁছাতে চল্লিশ‚'পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় তো লাগেই। তার আগে স্নানখাওয়ার ঝামেলা। অথচ বাবা ঠিক সেই সময়েই বাথরুমে ঢুকে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকবেন। কাশি‚ কফ ফেলার শব্দ‚ প্যানে জল ঢালার শব্দ সব শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও আরো দশ পনেরো মিনিট বাথরুমে বসে থেকে কী যে করেন‚ কে জানে! ভাগ্যিস তার স্ত্রী সুনন্দার স্কুলটা বাড়ির পাশেই। তাছাড়া কী বাবার সাথে সুনন্দার পটেও বেশ। সত্যি বলতে কি‚ ছেলের চেয়ে ছেলের বৌ'ই আন্তরিকভাবে বাবার যত্নআত্তি বেশী করে। নইলে যে কী হতো!
এ নিয়ে বাবাকে কিছু বলাটাও চাপের। মা মারা যাওয়ার পর এমনিতেই ভীষণ রগচটা হয়ে গেছেন। তারপর দীর্ঘদিন কোলিয়ারির মুটেমজুরদের সাথে কাজ করার দরুন ভাষাটাও খুব একটা মোলায়েম নয়। একদিন বাথরুমে অনর্থক বেশী সময় কাটানো নিয়ে‚ একদিন যত্রতত্র বিড়ির টুকরো ফেলা নিয়ে‚ কোন কোন দিন এমনিই … বাবার সাথে সন্দীপের তর্ক লেগেই আছে। হাওয়া গরম হওয়ার আগেই অবশ্য "আঃ‚ সন্দীপ!" বলে মৃদু ধমক দিয়ে সুনন্দা বাবাকে টেনে সরিয়ে নিয়ে যায়। আর বেরিয়ে যাওয়ার সময় প্রায় প্রতিদিনই সন্দীপ স্পষ্ট শুনতে পায় "ওটা একটা শুয়োরের বাচ্চা। বৌমা‚ তুমি ঠিক কী দেখে এই পাঁঠাটাকে বিয়ে করেছিলে‚ বলো তো?"

#
খুব বেশী বড়ও নয়। ৫ ফুট বাই ৮ ফুট বা এমনি কিছু একটা মাপ হবে বাথরুমটার। শখ করে মেঝেতে এবং পাশের দেওয়ালগুলোতে সাদা টাইলস লাগিয়েছিলেন কুঞ্জবাবু। ছাদটা শুধু টকটকে মেজেন্টা রঙের। বাঁ দিকে একটা তাকে সাবান‚ শ্যাম্পুর টিউব‚ বডিওয়েলের ফাঁকা শিশি‚ রেজার। ডানপাশের দেওয়ালে দুটো ফোকর। তার একটা থেকে সুনন্দার ব্যবহৃত স্যানিটারি ন্যাপকিনগুলো অদ্ভুত আঁশটে গন্ধ ছড়ায়। আরেকটা ফোকর দিয়ে চুঁইয়ে নামা আলোর মধ্যে দিয়ে কুঞ্জবাবু বিড়ির টুকরোগুলিকে পাশের গলিতে ফেলে দেন। মানে আর পাঁচটা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ল্যাট্রিন কাম বাথরুমের সাথে বিশেষ কোনো পার্থক্যই নেই। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে‚ সন্দীপের মা মারা যাওয়ার পর কুঞ্জবাবু হঠাৎ একদিন লক্ষ্য করলেন‚ বাথরুমটার একটা আশ্চর্য ক্ষমতা আছে সমস্ত অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার। এ যাবত্‍ তিনি যা যা পান নি‚ এই গত দেড় দু বছরে স্বাভাবিক‚ অস্বাভাবিক সেই সমস্ত  অপ্রাপ্তিকে তিনি নিয়মিত নেড়েচেড়ে দেখছেন‚ কার্টসি এই ৫ বাই ৮ এর বাথরুম।
গত দেড় দু বছরে তিনি অন্তত বার পঞ্চাশেক সন্দীপের মায়ের সাথে কথা বলেছেন‚ ঝগড়া করেছেন‚ গোটা কুড়ি নেতাকে গুলি করেছেন‚ একটা নেড়ি'র (যেটা তার বাঁধানো দাঁতের একপাটি নিয়ে গিয়ে  ঘোষদের আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছিল) পোঁদে কষিয়ে লাথি মেরেছেন। দুবার লটারিতে এক কোটি করে মোট দু কোটি টাকা পেয়ে তার মধ্যে ৫০ হাজার টাকা ঝরিয়া'র সেই কুলির কালো‚ বেঁটে বৌটাকে( যার স্বামীটার এক পা  কুঞ্জবাবু দায়িত্বহীনতার জন্যেই কাটা পড়েছিল) দান করেছেন। দুবার প্যারিস‚ দুবার ন্যুইয়র্ক‚ বার ছয়েক কাশ্মীর আর অরুনাচল প্রদেশ থেকে ঘুরে এসেছেন। অদ্ভুত মনে হলেও এটাই সত্যি যে শুধু এই পাঁচ বাই আট বাথরুমের দৌলতেই তিনি কদিন আগে স্টেট বাসের এক বেয়াদব কন্ডাক্টরের গাল ঠাঁটিয়ে চড় কষেছেন। ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের কাছে হেরে যাওয়ার পর‚ গ্রামের শ্মশানবন্ধু স্পোর্টিং ক্লাবকে দিয়ে মোহনবাগানকে পরপর

তিনবার ৪-০ ব্যবধানে গোহারান হারিয়েছেন। গত মঙ্গলবার যখন কুঞ্জবাবু সুনন্দার শ্যাম্পু করা চুলগুলোকে নাকের উপর চেপে ধরে প্রাণভরে সেই গন্ধ নিচ্ছিলেন‚ আর সুনন্দা গাছের পাতা খসানোর মতো করে গা ঝাঁকিয়ে হেসেই যাচ্ছিল‚ হেসেই যাচ্ছিল‚ হেসেই যাচ্ছিল…
সেদিন সন্ধ্যায় লেটে কলেজ পৌঁছানো নিয়ে ছেলের সাথে মারাত্মক তর্কাতর্কি হলে কুঞ্জবাবু সন্দীপকে আরেকবার মুখের উপর শুয়োরের বাচ্চা এবং পাঁঠা বলেছিলেন।

সুনন্দা স্কুলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে এক সপ্তাহের জন্যে এডুকেশনাল টুরে গেছে। সন্দীপ কলেজ‚ কলেজ থেকে ফিরে কখনো হোটেলে খেতে‚ কখনো বন্ধুদের সাথে ব্রিজের আসরে যায়। কাজেকাজেই কুঞ্জবাবু এখন দিনের অধিকাংশ সময়টুকু বাথরুমেই কাটান। ইতিমধ্যে তিনি আর সুনন্দা মিলে বাড়ির উঠোনে সাতটা ছাতিম আর গোটা তিনেক শিউলির গাছ পুঁতেছেন। দিন তিনেকের মধ্যেই সেগুলো বড় হয়ে উঠলে‚ সন্ধ্যের পর তা থেকে এমন সুগন্ধ ছাড়বে না‚ সারা পাড়া একেবারে ম ম করবে! তারপর একদিন একদিন সুনন্দার স্কুটিতে চেপে বাজার গিয়েছিলেন। ফেরার পথে সুনন্দাকে তিনি দই ফুচকা খাওয়ালেন। নিজে খেলেন একটু বেশী টমাটো সস দিয়ে ফুল প্লেট মিক্সড চাউমিন।

সকালে উঠে সন্দীপ দেখলো‚ বাবা যথারীতি বাথরুম দখল করে বসে আছেন। কখন ঢুকেছেন কে জানে! বিড়ির গন্ধ ছাড়লেও ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে না। কাশি‚ কফ ফেলার শব্দও নেই। তার মানে শেষ স্টেজই চলছে। সন্দীপের অনুমান ঠিক হলে আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বাবা বেরিয়ে আসবেন। টুথব্রাশে টুথপেস্ট লাগাতে লাগাতে বাথরুমের দরজা খুলে গেল। সন্দীপ সে দিকের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করতেই কলিং বেল বেজে উঠলো। দরজা খুলে দিতেই সুনন্দা স্কুলের হেডটিচার‚ স্কুল সেক্রেটারিসহ আরো ছসাত জন এসে ঢুকলেন। সাতসকালে এরা আবার কেন! সন্দীপ খানিক বিরক্তি খানিক ভীতিমিশ্রিত জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সকলের মুখের দিকে তাকালো। কুঞ্জবাবু একটা পুরনো গামছায় সর্বাঙ্গ মুছতে মুছতে দেখলেন‚ হেডটিচার হাতের এমন একটা ভাব করলেন‚ যার মানে‚ "চলুন‚ ভিতরে গিয়ে বলছি।" ভিতরে ঢুকে মিনিট খানেক একে অপরের  মুখ চাওয়াচাওয়ি করার পর হেডটিচার শুরু করলেন‚ "আজ ভোরে টুরে যাওয়া বাসটা অতিরিক্ত কুয়াশার জন্যে রাস্তার পাশের একটা গাছে গিয়ে ঢুঁ মারে‚ এবং তার ফলে ড্রাইভার‚ সুনন্দাসহ বেশ কয়েকজন মারাত্মক আহত হয়।" কুঞ্জবাবু ও সন্দীপের বিস্ফারিত দৃষ্টির সামনে দুঃসংবাদ পেশ করার ব্যাটনটা এবার স্কুল সেক্রেটারি নিলেন - "ওয়েল‚ দে ওয়ার অ্যাডমিটেড টু অ্যা লোকাল নার্সিংহোম‚ বাট আরফরচুনেটলি বোথ অফ দেম সাকাম্বড টু ডেথ!"
হঠাৎ সকলে স্তম্ভিত হয়ে দেখলেন‚ শ্যাওলা পড়ে থাকা কলতলা পেরিয়ে দৌড়ে বাথরুমে ঢুকতে গিয়ে কুঞ্জবাবু ভয়ংকর ভাবে আছাড় খেলেন। কিন্তু তত্‍ক্ষনাত্‍ একজন জিমন্যাস্টের মতো তত্‍পরতায় উঠে দাঁড়িয়ে‚ বিদ্যুত গতিতে আবার বাথরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করলেন।হতবাক অতিথিরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সন্দীপের দিকে তাকালে
ঘোলা চোখে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে সন্দীপ বল্লো‚ "বয়সের সাথে প্রোস্টেট ঢিলে হয়ে গেছে তো‚ এখন আর বেশীক্ষণ ধরে রাখতে পারেন না।"

Monday, 30 November 2015

নিউ কমিউনিস্ট তেলেভাজা কিংবা ১টি অসহিষ্ণু খিল্লি …

…সেই রাত থেকেই টিপটিপ করে বৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু ভ্যাপসা পচা গরমটা কিছুতেই যাচ্ছেনা। লুঙ্গির তলে পোঁদ ঘেমেনেয়ে একসা। "৩৬৫"র একটা পাতা ছিঁড়ে মুছে টুছে ডাব্বু করে যেই তাকে ড্রেনে ফেলে দিতে যাব, ওমনি  সে বলে উঠল - মাও।
কী জন্ডিস!  বাদী আবাদি কিচ্ছু নয়, শুধুমুধু মাউমাউ করে কেন?
ওমা! দেখি "৩৬৫" আর পেপার নেই। স্যানিটারি ন্যাপকিন হয়ে আমাকে বেদম মুখ ভ্যাঙাচ্ছে। আমি বল্লাম - কী মুশকিল, ছিলে পেপার, হয়ে গেলে ন্যাপকিন!
"৩৬৫" বল্লো - মুশকিল আবার কী? ছিল আলিমুদ্দিন, হলো নবান্ন।  ছিল ব্রাত্তো , হয়ে গেল পাত্থো। ছিলো বেল ভিউ, হয়ে গেলো পি.জি। ছিল ভাগনে, হয়ে গেল বলির পাঁঠা। ছিল ন্যানো কারখানা, হলো তেলেভাজার দোকান। এতো আকছার হচ্ছে।
আমি বল্লুম - সেতো হলো, কিন্তু এখন তোমাকে কী  নামে ডাকব? তুমি তো সত্যিকারের ন্যাপকিন নও, তুমি হচ্ছো  খবরের কাগজ।
৩৬৫ বল্লো - কাগজও বলতে পারো, ন্যাপকিনও বলতে পারো, আবার পরিবর্তনও বলতে পারো।
আমি বল্লাম - পরিবর্তন, কেন?  শুনে ৩৬৫ বল্লো - তা'ও জানোনা? বলেই মুখে খানিকটা কালি লেপে নিয়ে হোঁয়া হোঁয়া করে হাসতে শুরু করল। আমি খুব অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। মনে হলো ঐ কথাটা আমার বোঝা উচিত্‍ ছিল।  তাই সাততাড়াতাড়ি করে বল্লুম - ও হ্যাঁ হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি।"
সে হেসে বল্লো - হেঁহেঁহেঁ! এতো ইস্পস্ট বোঝা'ই যাচ্ছে। পাচু'র  'প', তরকারির 'ত' আর নবান্নের 'ন',
হলো - পতন। কেমন, হলো তো?
আমি ফের ঘেঁটে গেলাম। কিন্তু পাছে মালটা আবার বিটকেল ইস্টাইলে হেসে ওঠে বলেই হুঁহাঁ করে গেলাম। হঠাৎ দেখি, ড্রেন দিয়ে বৃষ্টির জল যাওয়া দেখতে দেখতে, সে বলে উঠলো - বিপ্লব চাও তো, নন্দীগ্রাম গেলেই পারো।

আমি বল্লাম - অত সোজা নাকি? রাস্তাফাস্তা কিচ্ছু চিনিনা। সে বল্লো - সোজা রাস্তা।  নন্দন টু ধুতি, সেখান থেকে কালীঘাট, ফুটপাত, বিধানসভা লোকসভা, নন্দীগ্রাম … গেলেই হলো।
তাইলে রাস্তাটা এট্টু ডিটেলে বাতলে দাও দিকিনি।
শুনে খুব সিরিয়াসপানা মুখ করে সে বল্লো - ইল্লি! মাজাকি নাকি? ওসব আমার কম্মো না। আমার পুরুস্কারদা থাকলে ঠিকঠিক বলে দিতে পাত্তো।
- তিনি আবার কিনি? আমি ছড়ালাম। থাকেন কোথায়? দেখা পাব কী করে?
- পুরুস্কারদা আবার কোথায় থাকবে, পুরস্কারেই থাকে। কিন্তু তার সাথে দেখা হওয়ার জো'টি নেই।
আমি বল্লাম - কী রকম কী রকম?
৩৬৫ বল্লো - কী রকম জানো, এই ধরো, তার সাথে দেখার করার জন্যে তুমি গেলে আলিমুদ্দিন, তখন তিনি থাকবেন নবান্নে, যদি নবান্নে যাও, দেখবে তিনি আছেন কংগ্রেসের পার্টি অফিসের পাশে চায়ের দোকানে, যতক্ষণে তুমি সেখানে পৌঁছাবে, ততক্ষণে তিনি চলে যাবেন ভিক্টোরিয়া হাউসের সভায়।
আমি বল্লাম - তাইলে তোমরা দেখা করো কী করে?
- সে অনেক কিচাইন! আগে হিসেব করে দেখতে হবে, দাদা কোথায় কোথায় নেই; তারপর হিসেব করে দেখতে হবে, দাদা কোথায় কোথায় থাকতে পারে; তারপর দেখতে হবে, দাদা এখন কোথায় আছে,  তারপর দেখতে হবে, সেই হিসেব মতো যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছবে, তখন দাদা কোথায় থাকবে। তারপর দেখতে হবে ……

আমি  তাড়াতাড়ি বল্লাম - রোসো রোসো। আগে বলো সে কী রকম হিসেব?
- সে ভারী শক্ত হিসেব। কী রকম দেখবে, বলেই একটা ডান্ডা নিয়ে ঠোক্কর মেরে, এই মনে করো নবান্ন, বলেই মুখে কুলুপ আঁটলো।
তারপর খানিক পরেই আবার - এই মনে করো নীরুপিসি বিপ্লব করছেন। খানিক থেমে - এই মনে করো পুরস্কারদা নোবেল পাচ্ছেন।
একবার করে ঠোক্কর মারে আর পাগলের মতো - এই মনে করো, ছোট্ট ঘটনা। এই মনে করো ষড়যন্ত্র। এই মনে করো চেয়ার মোছা'র ন্যাতা।
রেগেমেগে বল্লাম - ধুর্ বর্গের বাউল! কী সব ফালতু কপচাচ্ছো! এট্টুও ভাল্লাগেনা মাইরি।
- আচ্ছা আচ্ছা, চোখ বন্ধ করো। একটু সহজ করে বলছি।

চোখ বন্ধ করে আছি তো আছিই। কোনো সাড়াশব্দ নেই। চোখ খুলতেই দেখি একটা লম্বা দাড়িওয়ালা কাক মাথা নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করছে -  বলো তো, আগে চিত্র পিছে সিবিআই। মধ্যেখানে কী?
আমি রেগেমেগে বল্লাম - শালা! বুড়োবয়সে ভীমরতি হয়েছে?  মধ্যেখানে আর কেউ নেই, তুমি আছো, তুমি।
কাকটা দাড়ি নাড়িয়ে - হয়নি হয়নি, বলে দুলতে লাগলো।
আমি বল্লাম - হয়নি বল্লেই হলো, আলবত্‍ হয়েছে।
দাড়ির আড়াল থেকে ঠোঁট নড়ে উঠলো - আগে ছিলো নিরুপিসি, এখন আমি।
আমি বল্লাম - যাচ্চলে! তুমি হলে সবসময়ই তুমি।
সে বল্লো - উহুম! তোমাদের দেশে বুঝি পরিবর্তনের দাম নেই?

কথাবার্তা নেই, হঠাৎ দেখি, সবুজ সামিয়ানার ভিতর থেকে সুরুত্‍ করে একটা ভল্লুক নামলো। তার সবুজ রঙের ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, সবুজ রঙের চুল। একহাতে কলকাতা ইউনিভার্সিটি'র উপাচার্যের মত কী একটা ঝুলছে, অন্যহাতে একটা রং-চটা, পুরনো দরজির ফিতে;  তাতে সব সংখ্যাগুলো উঠে গেছে, শুধু ৩৪ টা পড়া যাচ্ছে। ফলে সে যা'ই মাপছে সেটা ৩৪ হয়ে যাচ্ছে…

হঠাৎ মাপামাপি থামিয়ে, বুড়ো আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো - বলি,  কোন দল? আমি বল্লাম - আগে ব্রাজিল ছিলাম। ওয়ার্ল্ড কাপে জিদান একবার ব্রাজিলকে এমন গোহারান হারালো, কেঁদেকেঁদে আর কূল পাইনে! সেই থেকে জার্মানি।
বুড়ো বল্ল - তা লয়, তা লয়। বলি অন্যায়ে আছো, নাকি প্রতিবাদে?
আমি বল্লাম - কোনো মানুষ আবার অন্যায়ে থাকে নাকি? সব সময় প্রতিবাদে, একশোবার প্রতিবাদে।

বুড়ো বল্ল - কী বুদ্ধির ছিরি! সব সময় প্রতিবাদে থেকে মরি আর কী! প্রতিবাদ করে করে নিজের গুমোরটাই ফাঁক হয়ে যাক! আমাদের দেশে বিরোধী থাকার সময় সিবিআই সিবিআই কর চেল্লানো দস্তুর। তারপর ক্ষমতায় এলেই সেটাকে সাঁ করে ষড়যন্ত্রের রূপ দিয়ে নীচে নামিয়ে দি।
এসব আলফাল কথা শুনে মেজকা'র মত ঘোঁকঘোঁক করে হেসে উঠতে যাবো, এমন সময় টেকো দাড়িওয়ালা কাকটা বলে উঠল - চোওওপ!!!  দেখছিস না উন্নয়ন হচ্ছে? এট্টু আস্তে কথা বল।" আমি ওই দশাসই ধমক শুনে রীতিমতো ঘাবড়িফায়েড। কোন দিকে যাব ভেবে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। কাকটা হঠাৎ কানের কাছে এসে বল্ল - আচ্ছা, ভয় পাওয়ার দরকার নেই, বরং গপ্পোটা শোনো।
আমি হ্যাঁ, না, কিছু বলার আগেই সে তার গপ্পো শুরু করে দিয়েছে … "মনে করো, ইতিমধ্যে রাজপুত্তুরের নীলসাদা রঙের বিক্রি কমে যাচ্ছে দেখে নিরুপিসি কলকাতাকে লন্ডন না বানিয়ে আর্জেন্টিনা বানাতে এক পা। ওদিকে মাথার উপর থেকে ব্রহ্মদৈত্যির মতো একটা ভয়  বলছে,  'খাপ, খাপ' লোকে ইস্পস্ট শুনতে পাচ্ছে 'বাপ, বাপ রে বাপ!' বুক দেখা যাচ্ছে, পেট দেখা যাচ্ছে! ওই গ্যালো রে, গ্যালো রে, করতে করতে প্রকাশ্যে হিসির দোহাই দিয়ে সকলে যে যার গালে, ঠোঁটে চুমু খাচ্ছে। বুড়োরা ভাবছে - ইসসসস!  ছোঁড়ারা ভাবছে - ওয়াও! এ.বি. পি বলছে - যদি 'পাপস তাল'ই হবে তবে রেপ নেই ক্যানো? সকলে বলছে - তাইতো তাইতো, রেপ নেই কেন, রেপ নেই কেন? কেউ তার জবাব দিতে পারলো না

আচমকা কাকটা প্রসন্নবদনে জিজ্ঞেস করলো - পোস্টার পেয়েছো, মিছিলের পোস্টার?
- কই, কিসের পোস্টার? বলতেই একগোছা ছাপা কাগজ বের করে আমার হাতে দিলো। পড়ে দেখলাম বেশ নকশাসহকারে লেখা রয়েছে …

      -:আনন্দ সংবাদ আনন্দ সংবাদ আনন্দ সংবাদ:-

আমরা সুবোধ অবোধ নির্বোধ, নেচার মেড, ম্যান মেড, হ্যান মেড, ত্যান মেড সমস্তরকম ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ প্রয়োজনানুযায়ী ঘরেঘরে ছোট বড় মেজো সেজো, আঁতেল, দাঁতাল, মাতাল, নায়ক, নায়িকা, গায়ক, গায়িকা, বণিক, গণিকা  মাইক্রো, মিনি, ম্যাক্সি সকলপ্রকার বুদ্ধিজীবী-সহযোগে ঘরে ছেলে ঢোকাইয়া থাকি।
-:opposition life price:- অর্থাৎ বিরোধীদের জন্যে তাহাদের জীবন মূল্য। আপনার লোকাল কমিটি, জেলা কমিটি, আন্ডারওয়্যারের সাইজ প্রভৃতি তথ্য সরবরাহ করিলে ডাকযোগে "ছেলে"  পাঠাইয়া থাকি।

             -:সাবধান সাবধান সাবধান:-
আমরাই এক এবং একমাত্র আদি ও অকৃত্রিম মিছিল কোম্পানি। আগে কিছু ধুতিপরা লালবাবুরা লেনিনে উদ্বুদ্ধ হইয়া ঘরেঘরে ছেলে ঢোকাইতো বটে, কিন্তু তাহাদের ভ্যালিডিটি শেষ হইয়াছে। ইহাদের শ্লোগানে  শুঁটকি মাছের গন্ধ শুঁকিয়া প্রতারিত হইবেন না।
মনে রাখিবেন, এখন আমরাই একমাত্র সস্তা ও টিকাও রেপ কোম্পানি।
বি:দ্র :- স-পুলিস পরীক্ষা প্রার্থনীয়।

কাক বল্লো - ক্যামোন হইসে কত্তা, যটিল না?
আমি বল্লাম - হুম, সবটা গেলা গেল না।
কাক গম্ভীর হয়ে বল্লো - হ্যাঁ, এট্টু কঠিন বটে। একবার একজন এসেছিলো তার নামে আবার ঘোড়ার খুরের মত নালপরা।
বুড়ো ফ্রেঞ্চকাট দাড়িতে সবুজ রঙ লাগাচ্ছিলো। হাঁঊমাঁউ করে তেড়ে এসে বল্ল - ফের 'নাল' বলবি তো, তো একচড়ে তোকে যাদবপুরের ভিসি করে দেবো। জানিস না, ওসব শুনলেই আবার নিরুপিসি রাগ করবেন। বলেই কথাবার্তা নেই ফোঁত্‍ ফোঁত্‍ করে কাঁদতে শুরু করলে। কাকটা তাতে থতমত খেয়ে বল্লো - না না, নাল বলিনি, নাল বলিনি। লাল বলেছিলাম। বুড়ো তাই শুনে আরো জোরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।

কাক ভয় পেয়ে বুড়োটাকে সান্ত্বনা  দেওয়ার জন্যে বেশ আস্তে আস্তে বল্লো - আন্দোলন আন্দোলন খেলবি?
সে আবার ক্যামোন খেলা, অবাক হয়ে ভাবছি। হঠাত্ দেখি, বুড়োটা একমুঠো ধুলো তুলে কাকের গায়ে ছিটিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো - নন্দীগ্রাম। কাক পাল্টা ধুলো ছিটিয়ে দিয়ে বল্লো - পার্কস্ট্রীট। বুড়ো বল্লো - সিঙুর। কাক - পাড়ুই।
এমনি করে ঠিক নিলাম ডাকার মত একটা করে নাম বলে আর এ ওর গায়ে ধুলো ছিটিয়ে দেয়। কখন খেলাটা শেষ হবে, কখন বাড়ি যাবো, ভাবছি। ও'ম্মা! দেখি আরো কটা লোক এসে হাজির। তাদের চুল সাদা, দাড়ি সাদা, গোঁফ সাদা, ধুতি পাঞ্জাবি সওওওব সাদা। কেবল মাথার ফেট্টিটাই লাল। তারাও এসে সমান উত্‍সাহে ডাক দিতে লাগলো। কাক যদি বলে - আমলাশোল , বুড়ো বলে - বানতলা। লাল ফেট্টিরা বলে -ত্রিপুরা।
- যাদবপুর
-প্রেসিডেন্সি
-কেরল
গুজরাট
কিউবা
রাশিয়া
হনোলুলু
ম্যাডাগাস্কার
এমনি ডাকের পর ডাক চলতেই থাকতো। কিন্তু সাদা দাড়িওয়ালা একজন এসে 'মিত্রোঁ, খাগড়াগড়' বলতেই … কোত্থেকে একগুচ্ছের রবীন্দ্রনাথের মত দাড়ি কিন্তু গোঁফকাটা লোক এসে - বাঙলাদেশ, পাকিস্তান,  আফগানিস্তান, ইরাক, নাইজেরিয়া, আই এস আই এস, বোকা হারাম, এইসব বলতে লাগলো।

হঠাত্‍ কাকটা বুড়োটাকে জিজ্ঞেস করলো - পোস্টারটা ঠিক হয়েছে?
বুড়ো বল্লো - দাঁড়া, নীরুপিসিকে জিজ্ঞেস করে নি। বলেই একটা খালের পাশে, যেখানে একজোড়া সবুজ চপ্পল পড়েছিলো সেখানে গিয়ে উঁকি দিলো। ভিতর থেকে আওয়াজ এলো - কী রে শালা! (সরি, আই উইথড্র মাই ওয়ার্ড) কেন ডাকছিস?

চলবে …

বিঃদ্রঃ -  ইহা সুকুমারে উদ্বুদ্ধ আপাদমস্তক কল্পিত একটি ননসেন্স পাঠ্যবিশেষ। জীবিত বা মৃত কোনো ব্যক্তি‚ প্রতিষ্ঠান কিংবা ঘটনার সহিত ইহার সাদৃশ্য নেহাতই কাকতালীয়। সুতরাং পাঠ পরবর্তী কোনোরূপ কিচাইনের জন্যে কোম্পানি দায়ী নহে।

Wednesday, 25 June 2014

বীরভূমের প্রবাদ প্রবচন ও কিছু অসংলগ্ন কথাবার্তা

প্রবাদ প্রবচন কি মেয়েদের তৈরী? 

বীরভূমের প্রচলিত প্রবাদ প্রবচন নিয়ে খানিকটা দৌড়ঝাঁপ করার পর এই কথাটাই আগে আমার মাথায় এলো। কেন এলো , সেটাও বলছি। তবে আগে সো কল্ড "শ্লীল" লোকজনদের বলব এই পোস্ট থেকে দূরে থাকতে। কারণ শ্লীলতা'র মত আপেক্ষিক বস্তু  আর যায় হোক ভাষার বিবর্তনে কোন সাহায্য তো করেই না বরং বিস্তর প্রতিকূলতার সৃষ্টি করে। আর এই প্রবাদ প্রবচনগুলো যে যুগে জন্ম নিয়েছে , তখন ভাষার শ্লীলতাহানি নিয়ে সমাজ এতটা শুচিবাইগ্রস্ত ছিল না।

যে দুটো কথা বল্লাম;  সেগুলো যে আমার স্বকপোলকল্পিত নয় তারজন্য কয়েকটি উদাহারণই যথেষ্ট …

"অগত্যায় লাতি ভাতার।"
আক্ষরিক অর্থে অগত্যায় পড়ে নিজের দৌহিত্রকেই ভাতার( সংস্কৃত ভর্তাথেকে আগত , যার অর্থ স্বামী বা মালিক) রুপে স্বীকার করে নেওয়া। তবে পরোক্ষভাবে
প্রবাদটি নারীপুরুষনির্বিশেষে একজন ব্যক্তির চরম অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়ে হীনতর কোন কর্মে লিপ্ত হওয়াকেই বোঝায়। লক্ষ্য করুন ,  পরোক্ষভাবে যদিও প্রবচনটি নারীপুরুষনির্বিশেষে সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য কিন্তু এর প্রত্যক্ষ বা আক্ষরিক অর্থ কিন্তু নারীর দিকেই ইশারা করছে।

এরম আরো অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেখানে এই "ভাতার" শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন ধরুন ," যে দুখ কে সেই দুখ , (আমার) ভাতার ধরি কি সুখ! '' কিংবা "নাং (প্রেমিক ) এর আশায় ভাতার মারি"  ইত্যাদি ইত্যাদি। কোথাও নারীর অসহায়ত্ব , কোথাও অনুশোচনা , কোথাও নিজেকেই বিদ্রুপ করা , কোথাও আবার এক নারীর প্রতি অন্য নারীর নির্ভেজাল কটুক্তি।
যেমন ধরা যাক "এক পয়সার তেঁতুলবিচি , পোঁদ করছে খিচিবিচি। " অর্থাৎ আকস্মিক ধনলাভের পর আত্মঅহঙ্কারপ্রসুত অস্বাভাবিক আচরণ। একই অর্থবহনকারী একটি বহুপ্রচলিত প্রবাদও আমাদের সো কল্ড শ্লীল সমাজে প্রচলিত আছে। "নির্ধনের ধন হলে দিনে দেখে তারা।"

আর নারীর প্রতি নারীর বিশেষ করে বৌ শ্বাশুড়ী বা ননদ বৌদি/বৌমা'র চিরাচরিত বিদ্বেষের কথা তো সর্বজনবিদিত। আর সেই বিদ্বেষের গর্ভেই জন্ম নিয়েছে না জানি কত এইজাতীয় ধনরাশি!
বৌমাকে ঠাট্টা করে শ্বাশুড়ীর বাক্যবাণ " পোঁদে নাই ইন্দি(জল) ভজো রে গোবিন্দি ,অথবা  "বাবার জন্মে নাইকো গাই ,
চালুন নিং দুহাতে যায়!' ,  কিংবা " কত কি হয় সাধে , পিদিম জ্বেলি পাদে! " , কিংবা "সেই তো মল খসালি , তবে কেন হাসালি!" ইত্যাদিইত্যাদি।
কিংবা বৌয়ের বাপের বাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থাকে ব্যঙ্গ করে "হাঘরের বিটি রে ভাতঘরে পোলো(পড়লো) একথাল ভাত দেখি নেচিকুদি মোলো!" , কিংবা জনৈক "পদী " নাম্নী কিশোরী বধু'র রন্ধনজনিত অক্ষমতাকে বিদ্রুপ কর "কত রঙ্গ দেখালি পদী , অম্বলে দিলি আদা!"
তা যে যায় বলুন না কেন, এইসব প্রবাদ প্রবচনের গর্ভেই তত্‍কালীন সমাজে পণপ্রথা ও ততজনিত কারণে নববধূকে যে দূর্ভোগ পোয়াতে হতো , তা এইসব প্রবাদ প্রবচনের মধ্যেই স্পষ্ট।  অবশ্য সেই পরিস্থিতি যে এখনও খুব একটা উন্নতি হয়েছে তা কিন্তু নয়। কার
ণসেই ঐতিহ্য মেনে এখনও " অম্বলে আদা " দেওয়ার মত ঘটনার জন্যে নববধূকে মানসিক নির্যাতন এমন কি কিছুকিছুক্ষেত্রে শারীরিক উত্‍পীড়নও সহ্য করতে হয়।

অবশ্য তত্‍কালীন বধূরাও যে বৃদ্ধা শ্বাশুড়ীকে কিংবা বয়স্ক ননদকে পাল্টা দিতেন না এমন নয়। তাদের বাক্যবাণও তীক্ষ্ণতা বা রসঘনতার দিক থেকে খুব একটা পিছিয়ে ছিল না।
প্রথমেই উল্লেখ করা "যে দুখ কে সেই দুখ, (আমার ) ভাতার ধরি কি সুখ?" কিংবা শ্বাশুড়ীকে শুনিয়ে শুনিয়ে সমবয়সী প্রতিবেশিনীকে নিজের অবস্থার এইভাবে বর্ণনা দেওয়া " যে আমার বিহ্যা(বিয়ে) তার দুপায়ে আলতা!"
কিংবা "শ্বশুরবাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থা আর তারজন্যে নিজের কষ্টভোগ'কে তুলে ধরার জন্যে "দূর থেকি শুনল্যাম জগঝম্প বাজনা , কাছে এসি দেখল্যাম লাঠি আর লাদনা!"

এ তো গেল " ফর ওউমেন বাই ঔমেন " টাইপের সরলীকরণ।তাছাড়াও বহু বিষয়ে বহু প্রবচন বীরভূম তথা বাঙলার কোল আলো করে আছে। তাদের কোনোটাই অভিজ্ঞতা থেকে লব্ধ সাদারণ জ্ঞান , কোনোটাই নিছকই এক সম্প্রদায়ের অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ, কোনোটা আবার ভীষণ ব্যতিক্রমী।
যেমন ধরুন

"কালো বামুন, কটা মাল, কয়রাচোখ্যা মুসলমান
ঘরজামাই আর পোষ্যপুত্র সব শালা সমান"
এইসব প্রবাদ যদিও একটা নির্দিষ্ট একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রচিত , এবং এর সত্যতা নিয়েও রীতিমতন সন্দেহ আছে কিন্তু একই সাথে এখন কোথাও কোথাও যে একে বেদবাক্যের মত মনে করা হয় এটাও সত্য। নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বদগুণের উল্লেখ করে আরো অজস্র প্রবাদ প্রবচন রচনা করা হয়েছিল , যাদের মধ্যে -
           " মুখুটি কুটিল বড় , বন্দ্যঘটী সাদা
              আর চট্ট হারামজাদা"
কিংবা -
                   "তেঁতুল হয়না মিষ্টি
                     নেড়ে হয়না ইষ্টি।"
কিংবা -
                   "পুরুষের ভালোবাসা
                    মুসলমানের মুরগি পোষা।"

এরকম আরো অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। এত গেল একে অপরকে কটুক্তি করে রচিত প্রবচনগুচ্ছ। এবার যে ব্যাপারটা আলোচনা করব সেটাই আমাকে সবচেয়ে বেশী চমকে দিয়েছে। তত্‍কালীল মানুষ ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলেন এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু যদি দেখেন কর্মক্ষমতায় বিশ্বাসী  মানুষ তখনও ঈশ্বরকে হয়ত একেবারে উড়িয়ে দিতে পারেন নি , কিন্তু তাকে যে বিশেষ পাত্তা দিতেন না সেটা স্পষ্ট। নাহলে এরকম প্রবচন রচিতই বা হলো কিভাবে?
      "হে নারায়ণ , তরাও তরাও(ত্বরাও ত্বরাও)
        হাত পা লড়াও, হাত পা লড়াও(নড়াও)

অর্থাৎ ঈশ্বরের কাছে যখন বলছি -হে ঈশ্বর, আমাকে এই সংসারসমুদ্র পার করো। ঈশ্বর বলছেন
- দিব্যি তো হাত পাওয়ালা লোক হে তুমি। হাত পা নড়াও। নিজে চেষ্টা করে পার হও, বাপু, আমি ওসব ক্যাচালের মধ্যে নেই।

"হরি বলো মন রসনা, খেঁজুরগাছে পোঁদ ঘোঁষো না
ঘষতেঘষতে বেরোবে রক্ত , তবে জানব তুমি হরিভক্ত। "

                                         …চলবে …