Pages

Wednesday, 30 November 2016

বাথরুম


রিটায়ারমেন্টের পর থেকে বাথরুমে একটু বেশীই সময় কাটান কুঞ্জ বাবু। বিশেষ করে শীতকাল হলে তো কথাই নেই। চা খেয়ে সেই আটটার সময় বাথরুমে ঢুকবেন। তারপর আধ ঘন্টা ধরে বিড়ি খেতে খেতে খকখক করে কেশেই যাবেন। তার সাথে মিনিট পাঁচেক অন্তর অন্তর 'খ্যাক থুঃ খ্যাক থুঃ' বলে কফ ফেলার শব্দ। বাবার এই বদভ্যাসটা  খুবই বিরক্তিকর লাগে সন্দীপের। সে প্রায় ত্রিশ কিমি দূরে একটা সরকারি কলেজে ইংরেজি সাহিত্য পড়ায়। বাইক নিয়েই যাওয়া আসা করে যদিও‚ তবু পৌঁছাতে চল্লিশ‚'পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় তো লাগেই। তার আগে স্নানখাওয়ার ঝামেলা। অথচ বাবা ঠিক সেই সময়েই বাথরুমে ঢুকে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকবেন। কাশি‚ কফ ফেলার শব্দ‚ প্যানে জল ঢালার শব্দ সব শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও আরো দশ পনেরো মিনিট বাথরুমে বসে থেকে কী যে করেন‚ কে জানে! ভাগ্যিস তার স্ত্রী সুনন্দার স্কুলটা বাড়ির পাশেই। তাছাড়া কী বাবার সাথে সুনন্দার পটেও বেশ। সত্যি বলতে কি‚ ছেলের চেয়ে ছেলের বৌ'ই আন্তরিকভাবে বাবার যত্নআত্তি বেশী করে। নইলে যে কী হতো!
এ নিয়ে বাবাকে কিছু বলাটাও চাপের। মা মারা যাওয়ার পর এমনিতেই ভীষণ রগচটা হয়ে গেছেন। তারপর দীর্ঘদিন কোলিয়ারির মুটেমজুরদের সাথে কাজ করার দরুন ভাষাটাও খুব একটা মোলায়েম নয়। একদিন বাথরুমে অনর্থক বেশী সময় কাটানো নিয়ে‚ একদিন যত্রতত্র বিড়ির টুকরো ফেলা নিয়ে‚ কোন কোন দিন এমনিই … বাবার সাথে সন্দীপের তর্ক লেগেই আছে। হাওয়া গরম হওয়ার আগেই অবশ্য "আঃ‚ সন্দীপ!" বলে মৃদু ধমক দিয়ে সুনন্দা বাবাকে টেনে সরিয়ে নিয়ে যায়। আর বেরিয়ে যাওয়ার সময় প্রায় প্রতিদিনই সন্দীপ স্পষ্ট শুনতে পায় "ওটা একটা শুয়োরের বাচ্চা। বৌমা‚ তুমি ঠিক কী দেখে এই পাঁঠাটাকে বিয়ে করেছিলে‚ বলো তো?"

#
খুব বেশী বড়ও নয়। ৫ ফুট বাই ৮ ফুট বা এমনি কিছু একটা মাপ হবে বাথরুমটার। শখ করে মেঝেতে এবং পাশের দেওয়ালগুলোতে সাদা টাইলস লাগিয়েছিলেন কুঞ্জবাবু। ছাদটা শুধু টকটকে মেজেন্টা রঙের। বাঁ দিকে একটা তাকে সাবান‚ শ্যাম্পুর টিউব‚ বডিওয়েলের ফাঁকা শিশি‚ রেজার। ডানপাশের দেওয়ালে দুটো ফোকর। তার একটা থেকে সুনন্দার ব্যবহৃত স্যানিটারি ন্যাপকিনগুলো অদ্ভুত আঁশটে গন্ধ ছড়ায়। আরেকটা ফোকর দিয়ে চুঁইয়ে নামা আলোর মধ্যে দিয়ে কুঞ্জবাবু বিড়ির টুকরোগুলিকে পাশের গলিতে ফেলে দেন। মানে আর পাঁচটা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ল্যাট্রিন কাম বাথরুমের সাথে বিশেষ কোনো পার্থক্যই নেই। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে‚ সন্দীপের মা মারা যাওয়ার পর কুঞ্জবাবু হঠাৎ একদিন লক্ষ্য করলেন‚ বাথরুমটার একটা আশ্চর্য ক্ষমতা আছে সমস্ত অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার। এ যাবত্‍ তিনি যা যা পান নি‚ এই গত দেড় দু বছরে স্বাভাবিক‚ অস্বাভাবিক সেই সমস্ত  অপ্রাপ্তিকে তিনি নিয়মিত নেড়েচেড়ে দেখছেন‚ কার্টসি এই ৫ বাই ৮ এর বাথরুম।
গত দেড় দু বছরে তিনি অন্তত বার পঞ্চাশেক সন্দীপের মায়ের সাথে কথা বলেছেন‚ ঝগড়া করেছেন‚ গোটা কুড়ি নেতাকে গুলি করেছেন‚ একটা নেড়ি'র (যেটা তার বাঁধানো দাঁতের একপাটি নিয়ে গিয়ে  ঘোষদের আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছিল) পোঁদে কষিয়ে লাথি মেরেছেন। দুবার লটারিতে এক কোটি করে মোট দু কোটি টাকা পেয়ে তার মধ্যে ৫০ হাজার টাকা ঝরিয়া'র সেই কুলির কালো‚ বেঁটে বৌটাকে( যার স্বামীটার এক পা  কুঞ্জবাবু দায়িত্বহীনতার জন্যেই কাটা পড়েছিল) দান করেছেন। দুবার প্যারিস‚ দুবার ন্যুইয়র্ক‚ বার ছয়েক কাশ্মীর আর অরুনাচল প্রদেশ থেকে ঘুরে এসেছেন। অদ্ভুত মনে হলেও এটাই সত্যি যে শুধু এই পাঁচ বাই আট বাথরুমের দৌলতেই তিনি কদিন আগে স্টেট বাসের এক বেয়াদব কন্ডাক্টরের গাল ঠাঁটিয়ে চড় কষেছেন। ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের কাছে হেরে যাওয়ার পর‚ গ্রামের শ্মশানবন্ধু স্পোর্টিং ক্লাবকে দিয়ে মোহনবাগানকে পরপর

তিনবার ৪-০ ব্যবধানে গোহারান হারিয়েছেন। গত মঙ্গলবার যখন কুঞ্জবাবু সুনন্দার শ্যাম্পু করা চুলগুলোকে নাকের উপর চেপে ধরে প্রাণভরে সেই গন্ধ নিচ্ছিলেন‚ আর সুনন্দা গাছের পাতা খসানোর মতো করে গা ঝাঁকিয়ে হেসেই যাচ্ছিল‚ হেসেই যাচ্ছিল‚ হেসেই যাচ্ছিল…
সেদিন সন্ধ্যায় লেটে কলেজ পৌঁছানো নিয়ে ছেলের সাথে মারাত্মক তর্কাতর্কি হলে কুঞ্জবাবু সন্দীপকে আরেকবার মুখের উপর শুয়োরের বাচ্চা এবং পাঁঠা বলেছিলেন।

সুনন্দা স্কুলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে এক সপ্তাহের জন্যে এডুকেশনাল টুরে গেছে। সন্দীপ কলেজ‚ কলেজ থেকে ফিরে কখনো হোটেলে খেতে‚ কখনো বন্ধুদের সাথে ব্রিজের আসরে যায়। কাজেকাজেই কুঞ্জবাবু এখন দিনের অধিকাংশ সময়টুকু বাথরুমেই কাটান। ইতিমধ্যে তিনি আর সুনন্দা মিলে বাড়ির উঠোনে সাতটা ছাতিম আর গোটা তিনেক শিউলির গাছ পুঁতেছেন। দিন তিনেকের মধ্যেই সেগুলো বড় হয়ে উঠলে‚ সন্ধ্যের পর তা থেকে এমন সুগন্ধ ছাড়বে না‚ সারা পাড়া একেবারে ম ম করবে! তারপর একদিন একদিন সুনন্দার স্কুটিতে চেপে বাজার গিয়েছিলেন। ফেরার পথে সুনন্দাকে তিনি দই ফুচকা খাওয়ালেন। নিজে খেলেন একটু বেশী টমাটো সস দিয়ে ফুল প্লেট মিক্সড চাউমিন।

সকালে উঠে সন্দীপ দেখলো‚ বাবা যথারীতি বাথরুম দখল করে বসে আছেন। কখন ঢুকেছেন কে জানে! বিড়ির গন্ধ ছাড়লেও ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে না। কাশি‚ কফ ফেলার শব্দও নেই। তার মানে শেষ স্টেজই চলছে। সন্দীপের অনুমান ঠিক হলে আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বাবা বেরিয়ে আসবেন। টুথব্রাশে টুথপেস্ট লাগাতে লাগাতে বাথরুমের দরজা খুলে গেল। সন্দীপ সে দিকের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করতেই কলিং বেল বেজে উঠলো। দরজা খুলে দিতেই সুনন্দা স্কুলের হেডটিচার‚ স্কুল সেক্রেটারিসহ আরো ছসাত জন এসে ঢুকলেন। সাতসকালে এরা আবার কেন! সন্দীপ খানিক বিরক্তি খানিক ভীতিমিশ্রিত জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সকলের মুখের দিকে তাকালো। কুঞ্জবাবু একটা পুরনো গামছায় সর্বাঙ্গ মুছতে মুছতে দেখলেন‚ হেডটিচার হাতের এমন একটা ভাব করলেন‚ যার মানে‚ "চলুন‚ ভিতরে গিয়ে বলছি।" ভিতরে ঢুকে মিনিট খানেক একে অপরের  মুখ চাওয়াচাওয়ি করার পর হেডটিচার শুরু করলেন‚ "আজ ভোরে টুরে যাওয়া বাসটা অতিরিক্ত কুয়াশার জন্যে রাস্তার পাশের একটা গাছে গিয়ে ঢুঁ মারে‚ এবং তার ফলে ড্রাইভার‚ সুনন্দাসহ বেশ কয়েকজন মারাত্মক আহত হয়।" কুঞ্জবাবু ও সন্দীপের বিস্ফারিত দৃষ্টির সামনে দুঃসংবাদ পেশ করার ব্যাটনটা এবার স্কুল সেক্রেটারি নিলেন - "ওয়েল‚ দে ওয়ার অ্যাডমিটেড টু অ্যা লোকাল নার্সিংহোম‚ বাট আরফরচুনেটলি বোথ অফ দেম সাকাম্বড টু ডেথ!"
হঠাৎ সকলে স্তম্ভিত হয়ে দেখলেন‚ শ্যাওলা পড়ে থাকা কলতলা পেরিয়ে দৌড়ে বাথরুমে ঢুকতে গিয়ে কুঞ্জবাবু ভয়ংকর ভাবে আছাড় খেলেন। কিন্তু তত্‍ক্ষনাত্‍ একজন জিমন্যাস্টের মতো তত্‍পরতায় উঠে দাঁড়িয়ে‚ বিদ্যুত গতিতে আবার বাথরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করলেন।হতবাক অতিথিরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সন্দীপের দিকে তাকালে
ঘোলা চোখে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে সন্দীপ বল্লো‚ "বয়সের সাথে প্রোস্টেট ঢিলে হয়ে গেছে তো‚ এখন আর বেশীক্ষণ ধরে রাখতে পারেন না।"