Pages

Tuesday, 29 October 2013

পার্থ হালদারের চায়ের দোকান আর কয়েকটি মাথার পেঁচা/পীযূষ কান্তি বন্দ্যোপাধ্যায়

"আমাদের প্রত্যেকের মাথার মধ্যে একটা শাশ্বত পেঁচা আছে। একটা ইটারন্যাল শেয়াল,একটা কুলীন হায়েনা,
অথচ প্রত্যেকেই....

"পার্থ.এটা নিয়ে সতেরশো তিপ্পান্ন কাপ হলো রে। সব হিসেব করেছি রে ,পুজো করে অনেক শাড়ি পাই রে।  এবার কটা লালপেড়ে শাড়ি দিয়ে তোর ধার কড়ায়গন্ডায় শোধ করে দেব।
তোকে তো বলেছিলাম ,উগান্ডার সোনার খনিটা ...."

পার্থদা বিড়বিড় করতেকরতে খদ্দের সামলায়। হাঁড়ির মধ্যে পড়ে থাকা মিশ্রণের মধ্যে আবার পরিমাণমত চা পাত্তি আর চিনি ঢেলে দিয়ে ফোটাতে শুরু করে। "শালা ,যত্তসব ক্ষ্যাপাপাগলা! মরার আর জায়গা পায়না। উঠতে বসতে এই পার্থর দোকান।"

"একটা টোস্ট লাগাও তো জলদি"
কি টোস্ট ,এগ না বাটার?
বাটার।পার্থ ,একটু হাত ধোওয়ার জল...?
ওইতো টিনে রাখা,একটু উঠে নাওনা বাবা। সবই কি হাতে তুলে দিতে হবে নাকি?
কি ব্যাপার ,এত খচে কেন গো সকালসকাল?
আর বলোনা ,ওই বুড়োখ্যাপা এসে মেজাজের গাঁড় মেরে দিয়ে গেল।
আরে এককাপ চা খেয়েছে বলে মেজাজ গরম করার কি আছে,দাদা?
পাঁঊরুটি পোড়ানো শেষ। খসখসে এবরোখেবরো গায়ে মাখনের প্রলেপ দিতেদিতেই ফুঁসে উঠলো পার্থ হালদার। "এককাপ কি হে ,ডেলি তিনবেলা তিনকাপ চা আমার দোকানে ওর জন্যে বাঁধা। সেটা ব্যাপার না ,খাচ্ছিস খা ,তার উপর আবার পাই টু হিসেব দেবে ,আজ বল্লো সতেরশো তিপ্পান্ন ,তারপর চুয়ান্ন পঞ্চান্ন করে চলতেই থাকবে। এবার বল তো ,একসাথে ওই সতেরশো সারে সতেরশো কাপ চা ,মানে সাড়ে সতেরোশো গুন দেড়টাকা ,এতো টাকার কথা শুনলে মেজাজ বিগড়োই কিনা?"

"হাহাহাহা!তবে দ্যাখো হে পার্থশেঠ,আজকের দিনে এরম পার্ফেক্ট হিসেবনিকেশ মনে রাখা লোক খুব রেয়ার বুঝলে,
পয়সা নাহয় নাই দিল,হিসেবে কোন দুনম্বরী খুঁজে পাবে না কিন্তু"বলেই ঢুকেঢুকে  কাগজটা টেনে নিলেন পাইকর আউটপোস্টের ছোটবাবু রাকিবুলসাহেব।এরপর এককাপ বিনা চিনির চা ,পোড়ানো গ্লাস পাঁঊরুটি ,তারপর দুটো সিগারেট ,তিনটে বিড়ি ,খবরের কাগজ ইত্যাদির কক্ষপথ ঘুরে ঠিক দশটা বেজে চল্লিশ মিনিটে গিয়ে  অফিসে গিয়ে ঢুকবেন।
রিট্যায়্যার্ড হাইস্কুলের হেডটিচার তরণী মুখুজ্যে ,উকিল হোসেন আলি আর লটারির টিকিট বিক্রেতা পল্টু ধীবর ঠিক এইটুকু সময়ের মধ্যেই পরপর দোকানে  আসবে।
চা খেয়ে দুজন এখান থেকে হাটে যাবে ,সব্জি কেনা,
তোতনদার বইয়ের দোকান থেকে খবরের কাগজ নিয়ে তারপর সোজা বাড়ি। হোসেন আলি এখান থেকে তার বাঁধা মেয়েমানুষের বাড়ি যাবে। আজ তার বাড়িতে লক্ষীপুজো বা ওইজাতীয় কিছু একটা অনুষ্ঠান আছে।
#
"হাসি খুব পাপী ,যারা ভাল ,দেখিস ,তারা হাসেনা। দেখিস অমরেশপুরী হাসে ,ওমপুরী হাসে ,শালারা পাপী!
পাপের বীজ শালারা!"
হাইস্কুলের পাশে বুড়োবটের শেকড়ে বসে বুড়োদা তার স্বভাবসিদ্ধ ডায়লগবাজিতে চুর্। পাশে বসে আছে শহরের সবচেয়ে কুখ্যাত অল্পবয়েসী বখে যাওয়া আলালের ঘরের দুলাল'দের  গ্যাং" চল্লিশচক্রে"র সাত আট জন মেম্বার্। চল্লিশচক্র নামটা সাধারণ মানুষদের দেওয়া। কিছু ছাত্র আর ছাত্রাবস্থা টপকে আসা সদ্য বেকার হওয়া দুর্ধর্ষ ছেলেদের গ্যাং,বাইক নিয়ে এলাকায় তান্ডব করে বেড়ায় ,আবার অসুস্থ রোগীকে নিয়ে হাসপাতাল কিংবা জলঝড়ের মধ্যে শ্মশানযাত্রী হতেও না করেনা। তবুও ছেলেগুলো অন্যদের চোখে ঘৃনা এবং আতংক উদ্রেক করে।কিন্তু  বুড়োর সাথে ওদের বেশ পটে।

"সেতো বুঝলাম,বুড়োদা,কিন্তু কাঞ্চনজঙ্গা'টা আমাকে বিক্রি কর না ,আমার খুউউব দরকার্। আট কোটি,দশ কোটি যা চাইবে .তাই দাম দেব।" সিগারেটের খোলের মধ্যে গাঁজা আর সিগারেটের তামাকের মিক্সচার ভরতে ভরতে হাসলো  অশোক।

নারে অশকা ,ওটা আমার ভাইপো চালায়। দারুন ড্রাইভার,
যা চালায় না ,একেবারে একেবারে ঝড়ের অন্তরীপ।তুই যদি নিস তো হাওড়া দানাপুর লোকালটা নে, চার কোটিতে দিয়ে দেব। তাছাড়া উগান্ডা আর ব্রাজিলের সোনার খনিদুটোও বিক্রি করব ভাবছি।

সেই চেনা ডায়লগবাজি। শুনতেশুনতে মখস্থ হয়ে গেছে সব। সনাতন ব্যানার্জি ওরফে বুড়োদা ওরফে বুড়োক্ষ্যাপা  সত্‍ বংশের ছেলে। বিখ্যাত ক্ষ্যাপাকালীর যজমানিও তাদের্। সুতরাং নিতান্ত গরীবও বলা যাবেনা। বাকি ভাইরাও বেশ ওই নিয়েই নেড়েচেড়ে খাচ্ছে। শুধু ব্যতিক্রম এই বুড়োদা ওরফে বুড়োক্ষ্যাপা।
উত্তারাধিকারসুত্রে পাওয়া সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হলেও পারিবারিক মাথার অসুখ থেকে বঞ্চিত হয়নি। পার্থিব সম্পত্তির ব্যস্তানুপাতে বেড়েছে মানসিক সমস্যা। এখন তো ও  মনেমনে চল্লিশটা ট্রেন আর গোটাদশেক সোনার খনির মালিক।দিনরাত ওই লাভ আর লসের হিসেব কষছে। লোকাল ট্রেনগুলো চালিয়ে আজকাল তেমন প্রফিট নেই,তাই খদ্দের খুঁজছে ওগুলো বিক্রির জন্যে। সোনার খনিগুলোর অবস্থাও নাকি ভাল না! "শালা ,পাগলাচোদা আর কাকে বলে!

"নাও ,দুটান মারবে নাকি? নেশা পেলেই তো আবার খাঁড়া হাতে ছুটোছুটি করবে। যার তার কাছে যেওনা। কে কখন কেলিয়ে দেবে ,কে জানে!সেদিন ওই ব্রতচারী মাস্টারকে মেরেছিলে কেন?ও বেচারা তো হাইস্কুলের মেয়েদের নাচ শেখাতেই এসেছিল।"

কেজানে রে ভাই ,কেন মেরেছিলাম!মারামারি খুব পাপী জিনিস ,বল? দেখিস রঞ্জিত ,ড্যানি এই শয়তানেরা মারামারি করে। রাজেশ খান্না মারামারি করেনা ,বল?'

সে জ্ঞ্যান তো দেখছি টনটনে ,তবে ফালতু জ্বালাও কেন পাবলিককে? কুটকুটি উঠবে,সোজা হাঁড়িপাড়া'র চাঁপারাণীর কাছে ছুটবে ,নেশা পাবে ,সন্দীপের দোকানে গিয়ে বলবে অশোক বলেছে বড় তামাক দিতে ,বুঝলে? ফালতু কিচাইন করো না। টাকা দিলেও তো বালছাল লোককে দান করে দেবে!

"আর দেব না ,সত্যি দেব না,দেখিস। দে পাঁচ সিকে দে।"

"ছোট্টু ,খুচরো থাকলে দিস তো বে। সেদিন আমার কাছে খুচরো ছিল না বলে একটা দশটাকার পাত্তি গছালাম। শালা ক্ষ্যাপাচোদা ,একটা হাটের লোককে আমার সামনে টাকাটা দান করে দিল। আমার মাইরি পাছাফাছা জ্বলে উঠেছিল রাগে।"

পকেট হাতড়ে কটা খুচরো বের করে আনলো ছোট্টু।
"রাগ করার কি আছে বে!তিমির মুখার্জীর তো টাকার পাহাড় ,তুই একা আর কতটুকুই বা ওড়াতে পারবি ,ব্রো?
তাছাড়া জানিসই তো ,ও কয়েন ছাড়া নিতে চায়না। নোট দিলে হয় দান করবে নয়ত ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলে দেবে।"

বটগাছের গায়ে একটা বড়সড় ফোঁকলের দিকে চেয়ে হাতের মুঠোর মধ্যে খুচরোগুলো নিয়ে ঝুমঝুমির মত শব্দ করছিল বুড়োক্ষ্যাপা ,হঠাত্‍ পাঁই করে একটা কাঠবেড়ালীকে তাড়া করে হাঁফাতেহাঁফাতে ফিরে এসে হাসতে শুরু করল। "জানিস ,একদিন আমি ভুতেদের মিউজিক ডিরেক্টর হবো। শুনবি
,শুনবি তোরা ভুতেদের মিউজিক?এই দ্যাখ ,ঠুকচুং!ঠুকচুং!ঠুকচুং! " মুখে একটা অদ্ভুত আওয়াজ আর তার সাথে হাতের মুঠোয় লুকিয়ে রাখা খুচরোর ঝুমঝুমির
মিলিত ঐক্যতানে সত্যিই যেন একটা ভুতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হোল।এতক্ষণ নিজের ট্যাবটা নিয়ে ব্যস্ত ছিল অশোক। কাজ শেষ হতেই ঘুরে গিয়ে বল্ল "ও বুড়োদা ,মিউজিক না ,মিউজিক না ,বরং তোমার ওই ডায়ালগটা একবার শোনাও না। ওই যে আমাদের প্রত্যেকের মাথার ভিতরে ..

"একটা শাশ্বত পেঁচা আছে। একটা ইটারন্যাল শেয়াল ...
বিড়বিড় করতেকরতে বাসস্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে গেল বুড়োক্ষ্যাপা।

#
ঝমঝমিয়ে ঝরছে তো ঝরছেই। ধারাবাহিক বর্ষণে কানায়কানায় ভরে গেছে পুকুর ,মাঠ ,নদীনালা।আবহাওয়া দপ্তর কোন আশার খবর শোনাতেও নারাজ।দত্তদের পুকুরের জল রাস্তা ছাপিয়ে বড়সাঁকো পর্যন্ত উঠে গিয়েছে। এই মফস্বল শহরে এই ঝড়বাদলের মধ্যে রাত আটটার পর কোন খদ্দের আসার ভরসাও নেই। পার্থ হালদার লাস্ট বাসটার জন্যে অপেক্ষা করছে ,দুচার জন ছেলেছোকরা ,ডেলি অফিসযাত্রীরা নামেন। কেউ দু এক কাপ চা,কেউ একটা রামের পাঁইটের উষ্ণতা ভিতরে সেঁধিয়ে দিয়ে একসঙ্গেই হাঁটতেহাঁটতে বাড়ি ফেরেন।বাঁধা খদ্দের সব ,তাই একটু না বসে যায় কি করে!
একটু শীতশীতও লাগছে ,বাসটা যে কখন ঢুকবে ছাই! এক এই তীব্র বৃষ্টি তার উপর গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত কার্ফ্যু,কাজেকাজেই বাসস্ট্যান্ডে আজ লোকজন খুবই কম।সকালে রাকিবুল সাহেবের কাছে সব খবর পাওয়া যাবে। একে ব্যবসাপাতির এই হাল ,তারপর শালা এই টেনশন ,ভাল্লাগে শালা ,বেঁচে থাকার নিকুচি করেছে!হাঁড়ি ,কাঁচের গ্লাস ,পানপাতা ঢেকে রাখার জন্যে টকটকে লাল কাপড়টা সব ধোওয়া শেষ ,বাসটা কেন আসছে না ,কে জানে!
অন্যদিন এতক্ষণ ছাইপাশ বকেবকে মাথার ইস্ক্রু ঢিলে করে দেয় ,আজ শালা বুড়োক্ষ্যাপাটারও পাত্তা নেই। ধ্যেত ,এত বৃষ্টি ,বিরক্ত! দুপুরে আবার বসতবাড়ির দক্ষিণদিকের কাঁচা দেওয়ালটাও পড়ে গেছে ,
ছোটছেলেটাও সর্দিজ্বরে ভুগছে। আর বাঁড়া কতদিকই বা করবো!মরণ ছাড়া গতি নাই দেখছি। ঢংঢং করে থানার ঘড়িতে ৯টা বাজলো। লাস্ট বাসটা কি আজ আসবে না  নাকি?
স্বভাবসুলভ বিড়বিড়ানি সমেত দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলো পার্থ হালদার।

#

চারটে বাইক ঘ্যাঁসসস করে এসে ব্রেক করলো। চায়ের দোকান আর পাশের গ্যারেজের মাঝে যে গলির মত যে জায়গাটা ,ওখানে গাড়ি রাখতেরাখতে যীশুই প্রথম খবরটা দিলো।
"ও পার্থদা ,তোমার একজন ডেলি কাস্টোমার তো গেল গো।"
হালদার মুখ তুলে দেখলো অশোক ,রানা ,যীশু , ছোট্টু ,বিশাল আর বাপ্পা। বাইক থেকে নেমেই রানা চেল্লালো -"পাঁচটা ডিমটোস্ট, অশকারটাই এক্সট্রা লংকা।"

"দিচ্ছি দিচ্ছি। লবাবপুত্তুর সব ,যখন আসবে তখনই ঘোড়ায় জিন দিয়ে আসবে। তা কে গেল রে ,হরিবাবু নাকি?তা কি আর করা যাবে ,বল ,বয়সও তো হয়েছিল। আর কদ্দিন বাঁচবে?'

"যাহ!আমারটা শুনবে না নিজের ফাটা রেকর্ডই চালাবে? আরে হরিবাবু ফরিবাবু  না ,বুড়োদা ,মানে তোমাদের ওই সনাতন ব্যানার্জি ওরফে বুড়োক্ষ্যাপা ,কালকের ঝামেলায় ভোগে লেগে গেছে। কে নলিটাকে দু ফাঁক করে মুসলিমপাড়ার বড়ড্রেনে ফেলে দিয়েছিল।এইমাত্র দেখে এলাম ফাঁড়ির বকুলগাছটার নিচে পলিথিন জড়িয়ে শুয়ে আছে। সে যাকগে ,তুমি একটা আর এস এর সেভেন ফিফটি আর পাঁচটা গ্লাস দাও তো।"

কেঁপে উঠলো লুঙ্গি আর রঙচটা গোলগলা গেঞ্জিঢাকা একটা শীর্ণ অবয়ব। প্যান থেকে খানিকটা  ডিমের মিশ্রণ চলকে গিয়ে কাঠকয়লার স্তুপে গিয়ে ল্যান্ডিং করলো।
"কি করে রে?ওই খ্যাপাটাকে আবার কে মারলে!ভগবানের সত্যি বিচার নাই রে ,ছিছিছি!!"
"ভগবান কি করবে ?এই এত বৃষ্টি! ভগবান তো তখন রানীদিঘিতে মাছ ধরছিল।" বলেই খ্যাখ্যা করে হেসে উঠল সবকটা। কি নিষ্ঠুর নির্লিপ্তি ,অস্বাভাবিক উদাসীনতা! একেই বুঝি যুগধর্ম বলে! অথচ এই বখাটে কটার জন্যেই বোধহয় খেয়ে পরে বেঁচেছিল বুড়ো। বিশেষ করে ধনীবাপের একমাত্র  বখে যাওয়া রকবাজ ছেলে অশোকের জন্যে।তা সত্বেও ...
"এককাপ চা দিতেই তো তোমার ফাটতো বাওয়া ,দিনরাত খিস্তি করতে। থাক না ,এখন আর ওই পাগলাচোদার জন্যে শোক নাই বা চোদালে! দাও ,মাল আর গ্লাসকটা দাও। কই গো দাও "

বিশালের খোঁচায় সম্বিত ফিরলো হালদারের্।

"উঁ? এই সক্কালবেলাতেই মদ গিলবি ,বাবুরা? তারচে বরং পেসাল করে কফি করে দিচ্ছি ,টোস্টটা খেয়ে কফি খা। থানার ছোটবাবুরও আসার সময় হোলো ,দেখলে ..."
বাকি কথাটুকু ক্যোঁত করে কফের মত গিলে ফেল্লো হালদার্। কারণ ততক্ষণে তীক্ষ্ণ ছুরির মত সোজা মুখ তুলে তাকিয়েছে অশোক।
"জ্ঞ্যান দিওনা ,পার্থদা। শালা ,ফ্রি আডভাইস চাইনি। যদ্দিন আছি ,স্ফুর্তি করতে দাও। এই তো জীবন গো। কালকে বুড়োক্ষ্যাপা আমার আর ছোট্টার সাথে বুড়োবটগাছতলায় তামাক খাচ্ছিলো আর আজ দেখে এলাম গলাটা হ্যাঁ হয়ে কাটাপাঁঠার মত কেলিয়ে পরে আছে।
আর ওই ছোটবাবু তো কোন ছার ,তোমাদের ওই বড়বাবু সান্যাল না কি নাম ,সেও এই অশোক মুখার্জিকে হাড়েহাড়ে চেনে। কেউ কিচ্ছু বলবে না ,তুমি দাও তো। তোমায় কেউ কিছু বল্লে আমার দায়িত্ব।"

"গেলো ,এই সাতসকালে মদ গেলো। আমার কি!বাপের পয়সায় খাবে ,আমার তো সেল হলেই ভাল। আমি কি আর ...
বিড়বিড় করতেকরতে রয়্যাল স্ট্যাগের একটা বোতল আর পাঁচটা গ্লাস নামিয়ে দিল হালদার।
"আর শালা বৃষ্টিও যেন সাপের পাঁচ পা দেখেছে! বিরক্ত ,এই জলেঝড়ে কোথাও যাওয়ার থাকবে না ,আর যত আপদ এসে জুটবে এই পার্থ হালদারের দোকানে ,ক্যানো এলাকায় কি আর দোকান নাই?সেখানে গিয়ে মরলেই তো পারে সব!
মিচকি হাসতেহাসতে পেগ বানাতে থাকে রানা। এসব ওদের জানা। এবার পার্থদা ,বেশ শব্দ করে প্লেটসমেত টোস্টগুলো নামিয়ে দিয়ে যাবে।যত রাগবে ,প্লেট আর গ্লাস রাখার সময় ততজোরে ঠক করে আওয়াজ তুলবে। এগুলোকে আর  তত পাত্তা দেয়না ওরা। বিড়বিড় করতেকরতে এখন লটারির টিকিট মেলাচ্ছে পার্থ হালদার।
"এখন কেউ বাকি চাইতে এলে কুরুক্ষেত্র ঘটবে।"

#
আরে না হে ,এই কম্যুন্যাল টেনশন তো ইচ্ছে করে তৈরি করা হয়েছে। কালীতলার পাশে যে ডিউ ড্রপ ' নামে নার্সারি স্কুলটা ছিল না ,ওইটাকে নাকি মুসলিম মিডিয়্যাম করার প্ল্যান চলছিল। তাহলে সরকারি অনুমোদনটাও পাওয়া যেত আর কি!"

"কিন্তু তাই বলে কালীমন্দিরের পাশে?পুরো পাইকরে আর জায়গা পেল না? হিন্দুরা কি মরে গেছে ভাবছেন ? রক্তারক্তি হয়ে যাবে তবু ওইখানে ওই আল হামড়া-র স্কুল হতে দেব না।

আরে ধ্যেত ,ফালতু না বকে চা খান তো ,দাদা। এই ডিউ ড্রপকে আল হামড়া করতে যারা মরণপণ করে লেগেছেন ,তাদের কজন মুসলমান বলুন তো?
স্কুলের অধিকাংশ স্টাফস ,ম্যানেজিং কমিটিতে কজন মুসলিম আছে? আর ডিউ ড্রপ থেকে আল হামড়া হলেই বা কজন মুসলমানের কি সুবিধা হবে বলতে পারেন? পড়বে তো সেই মুতাল্লেব মন্ডল ,দেবাশিস পালত্রি আর মুখার্জীদের ঘরের ছেলেমেয়েরাই। মোটা ডোনেশন আর এই ঝাঁ চকচকে ইউনিফর্ম কজন গরীব মুসলমান জোটাতে পারবে?"
তা যা বলেছেন রাকিবুল ভাই। আসলে এইসবে পঞ্চায়েত থেকে মিউনিসিপালিটির স্ট্যাটাস পেয়েছে তো ,ঠিকঠাক রপ্ত করতে পারেনি, কিকরে কি করবে ভেবে।না পেয়ে আনাড়ির মত ব্যাট চালাচ্ছে সব।"
একটা দারুন কিছু বলেছেন ভেবে হেঁহেঁহেঁ করে একচোট হেসে নিয়ে ভুঁড়িতে হাত বুলোতে লাগলেন আউটপোস্টের অফিসার ইনচার্জ ধীমান সান্যাল।

"না স্যার ,আমার তো উল্টো মনে হচ্ছে। সবকটা কাউন্সিলারই নিজের হাতে সাড়ে তিন হাত ,নিজের টাকা ইনভেস্ট করে ভোটে জিতেছে ,কাজেকাজেই পার্টিকে পাত্তাটাত্তা দেয়না।তো অগত্যা তাদের দলে টানতে গিয়ে এই জাতিগত সুড়সুড়ি ,লক্ষ্য করে দেখেছেন কি ,তিন .পাঁচ ,আট আর তেরো তিনটে ওয়ার্ডেই কাউন্সিলার মুসলমান ,আর এই চারটে ভোট যেদিকে যাবে বোর্ড তাদেরই। কিঙ্কর ঘোষ খুব চালু মাল ,স্যার্। ফাঁকের তালে ক্ষ্যাপাটাই ভোগে লেগে গেল ,আর কি!

"আচ্ছা ,তারিণীবাবু ,ও কি লেখাপড়া কিছু শিখেছিল?"

"হুম ,আমারই ছাত্র ছিল।পড়ুয়া হিসেবে মন্দ ছিল না কিন্তু মাধ্যমিক দেওয়ার পরেই মাথাটা বিগরোতে শুরু করে।"

"তাই বলি ,নইলে ওই যাত্রার ডায়ালগ বুড়োর মত একটা খেপচুরয়্যাস পাব্লিক আউড়াতো কি করে!"নিজের রসিকতায় নিজের হেসে কুটোকুটি হলেন সান্যাল।" যান হে ,রাকিবুল ভাই ,আপনি আর সরখেল মিলে পোস্টমর্টেমটা করিয়ে আনুন। আমি নাহয় হস্পিট্যাল সুপারকে একবার রিং করে দিচ্ছি।
#
বন্ধ করার ঠিক আগে ঝড়ের মত অশোকের পালসার গাড়িটা এসে দোকানের সামনে এসে লাগলো। উস্কোখুস্কো চুল ,রাঙাজবার মত চোখ ,দীর্ঘকায় সুদর্শন শরীরের আনাচকানাচে অনিয়ম আর অত্যাচারের ছাপ স্পষ্ট।
"কি রে ,আজ একা ,স্যাঙ্গাৎরা কোথায়?
উত্তর না দিয়ে সোজা টেবিলে এসে হেলমেটআর রেইনকোটটা খুলে রেখেই .."একটা থ্রি সেভেন্টি ফাইভ "

"আর এস তো শেষ রে ভাই। আই .বি নিবি?"এম সির নাম্বার ওয়ান ,নইলে ভোদকা ...

"থাক। একটা বুড়ো সাধু'র নিপই দাও। এটা ওই পাগলাটার ফেভারিট ব্র্যান্ড ছিল। শালা ,মুসলিমপাড়ার লোকেরাও ভালবাসত ,হিন্দুপাড়ার লোকেরাও ,তবে মারলো কে ,বল তো?"
পার্থ হালদার জানে এ সময় চুপ থাকার শ্রেয়। একটু বেশী কাঁচালঙ্কা মিশিয়ে সে ওমলেট বানাতে লাগলো।
ততক্ষণে পেগদুই আগুন নিটই চালান করে দিয়েছে অশোক।নাকের পাটা ফুলেফুলে উঠছে .জ্বলজ্বল করছে দুটো চোখ ,
"হাহাহাহাহা! চল্লিশখানা ট্রেন ,ব্রাজিলের সোনার খনি! একটু আগে দেখলাম ,গলার কাটা জায়গাটা দিয়ে গ্যাঁজলা বেড়োচ্ছে। শালা ,শুয়োরের বাচ্ছারা কেউ মর্গে পর্যন্ত গেল না ,জানো।আমি সবকটা ডোমকে পেট পুরে মাল খাইয়েছি। যারা শ্মশানে গেছিলো তাদেরও পেট পুরে মাল খাইয়েছি।ছোট্টারা বাড়ি গেল আর আমি এলাম তোমার কাছে। একশালা তো গেল ,তুমি গেলেই আমি শেষ পার্থদা। তুমি খাবে? চলো খাও।আজ বুড়োর অনারে তুমিও মাল খাও।

"আমি খাইনা সে তুই তো জানিস। আর কাঁদিস না ,ভাই ,কাঁদিস না। মরে বেঁচেছে ক্ষ্যাপা। বাড়ির লোকে ওকে দেখতে পারতো না। বাইরের লোকে দুরছাই করতো। তুই আর কদিন দেখতিস ,বল?
পার্থদা ,ওই বাল ,শুনছো ,এই আমাকে কক্ষনো কাঁদতে দেখেছ? আমি শালা ,মা মরে গেলেও কাঁদিনি,বাপ মরলেও কাঁদবো না ,আর ওই পাগলাচোদার জন্যে কাঁদবো!হ্যাট!!হ্যাট!
শালা!পাগলা না ছাই!সব জানতো শালা।বলেও দিয়েছিল ,আমরাই শালা বুঝতে পারিনি যে  সত্য্যিই আমাদের প্রত্যেকের মাথার মধ্যে একটা শাশ্বত পেঁচা আছে। একটা ইট্যার্ন্যাল শেয়াল ,একটা কুলীন হায়েনা ,অথচ ..
ওই নালায় ,তোমাকে বলে যাচ্ছি হে পার্থ হালদার ,ওই নালাতে আবার কেউ পড়ে থাকবে। আমিও হতে পারি ,তুমিও কিংবা আমাদের প্রত্যেকের মাথার মধ্যেই যেসব শাশ্বত পেঁচারা থাকে ,যতসব কুলীন...
ওমলেটের শেষ কুটিটা নিয়ে টলতেটলতে বেড়িয়ে গেল অশোক।
হালদার পাশের গ্যারেজের মিস্ত্রি মিঠুনকে চিত্‍কার করে ডাকতে লাগলো  -"ও মিঠুন ,আজও অশকা গাড়ি রেখে পালালো। আমার দোকানে জায়গা কম ,বাপ। এট্টু তুলে রেখে দে।"বৃষ্টির টিপটিপানির শব্দে মিঠুন ঠিক কি বল্লে শোনা গেল না।

Monday, 21 October 2013

সেভেন্থ সিম্ফোণী

"না না না না ,বাজে বকে লাভ নেই ভাই। নাও ধরো। ওহ সরি ,তোমার তো আবার ওসব চলে টলে না। সিগারেট চলে তো,নাকি সেটাও..বাকি কথাটুকু অট্টহাস্যের তোড়েই ভেসে গেল। আমার মিউজিক ডিরেক্টর খুব চালু ছেলে,বুঝলে? ও বল্লো যে ,সেভেন্থ সিম্ফোণী নিয়ে বাঙলায় তেমন কাজ নাকি এখনো হয়নি টয়নি। হাহাহাহা! বাঙলা তো এখনো সত্যজিত মৃনাল আর ঘটকের শৈশবেই  আটকে,না কি বলো? বহুচর্চিত বিষয় ,বুইলে কিনা  ,ঠিকঠাক লাগাতে পারলে...হাহাহাহা!
আর শুনলুম তুমিও বেশ ভালই ল্যাখোট্যাখো।  তো ওই পাবলিশার দত্তদা বল্লে তোমার কথা,
আররে ভায়া ,শুনেছো কোনদিন কবিতা লিখে কারো পেট ভরেছে? গান লেখো ভায়া গান....পরিশেষে আবার একটা সুদীর্ঘ হাহাহাহা....
#
ব্যস্ত দুপুর ,সটাসট সরে যাচ্ছে সরকারি বাস,পেছনে বিভিন্ন উপদেশ সম্বলিত নাশন্যাল পারমিটওয়ালা লরি, প্রাইভেট কার। পুজোর আর কদিনই বা বাকি,কাজেকাজেই বেশ হেলথি রকমের ভিড়। ভিড়ের মধ্যে থেকেই চাক্কুর মত চমকে উঠলো একঝাঁক টিনেজ চিৎকার-"ওহ মাই গড!ওই দ্যাখ দূর্বাদল ব্যানারজী যাচ্ছে।
কোন দূর্বাদল রে, সিটি কলেজের না প্রেসিডেন্সির?
ধ্যেত! আরে ইয়ং সেন্সেসন, সেই কমিউনিটি হলে আলাপ হল না,মনে নেই?
ওহ!দ্য  কবিই ই ই ই ই ই ই "
ইলাস্টিসিটির চুড়ান্ত সীমা পার হয়ে শব্দটা ধাক্কা খেতেখেতে জঞ্জালের স্তুপের উপর পাক খেতে থাকা মাছিদের ভনভনানির কোল ঘেঁষে ফুচকা-স্টলের পাশ দিয়ে ড্রিবল করতে
করতে একটা গ্লাক্সোবেবি টাইপের ফ্যাটসো জ্যামের সামনে এসে খোয়ারিকে ইয়া একটা সট মারলো রুটিনপায়ে,
ঘ্যাঁচ  ঘাঁচ করে লাগাতার ব্রেকের শব্দ,ট্র্যাফিকপুলিসের হাত কন্টিনিউ উঠছে আর
নামছে।"ধ্যুর বাল!একে তো ভয়ংকর রকমের রোদ  আর গরম,তার উপর  কালেকশন কম ,আর পাব্লিকও যা রগচটা হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন....

ছাতার নিচে কোঁকড়ানো চুলে ঢাকা ঘাড় থেকে মেরুনমেরুন টপের গভীরে লবনের স্রোত ভাঙার শব্দ।সামনে একটা
বিয়ার বারে গলগল করে লোক ঢুকছে আর বেরুচ্ছে। ঠিক রাস্তার ওপারে চটি পেতে বসে একটা চিরবিষণ্ণ চেহারার বুড়ো তরমুজ তরমুজ বলে প্রাণপণ চেল্লাচ্ছে। রিকশা থেকে কুতকুতে চোখের তীর একটা ট্রাকের জানলায় গিয়ে ক্লোস আপ নিতেই ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা চাইনা ফোনে শ্রিল ভোজপুরি গায়িকা অদ্ভুত আলাপ শুনে স্কুটি থেকে মাটিতে পা নামালো একটা বড্ড চেনা স্টাইলের কনভারশেসন- "দ্যাখো সোনা,ভীষণ জ্যামে ফেঁসে গেছি গো। আর মিনিট দশেক ওয়েট করতে পারবে না? প্লিয বস,একটু বোঝ ,একটা পাঁচ বাজছে তারপর যা গরম ,ব্লা ব্লা ব্লা ...
দ্য নাম্বার ইউ আর ট্রাইং টু রিচ ইজ কারেন্টলি সুইচড অফ ...যাহ!
ধ্যেত শালা!সব সময়  নকশা ,রাগলে রাগ ,মরগে ,আমার কি!
জানি সব জানি। এখন নিশ্চয়ই কোন এলেমদার লাভার এসে জুটেছে।এখন এই ছা পোষা কলমপেষা কেরানির প্রেমে কি আর তোমার পোষাবে,ধন! শালা! পুরো দুনিয়াটাই ছিনাল ,বাল!
চায়ের দোকানের সামনে লম্বা ভীড়ের কুটি শব্দসমেত  ভেসে আসছে। হ্যাঁ ,চা বিস্কুট হোলো,আর কি ,বলুন ,পান?জর্দা না মিষ্টি? না না ,খুচরো দিন ,খুচরো দিন,এই বাজারে খুচরোর যা আকাল!
#

মিউজিক ডিরেক্টর তনুজ তনয়ের  স্পষ্ট নির্দেশ গানের কথা যেন জোরদার হয় ,মানে ওই গুরুগম্ভীর সেভেন্থ সিম্ফোণীর সাথে যেন শব্দের কৌলীন্যও খাপ খেয়ে যায়। আনকোরা কবির তো ভাবতেও ভয় করছে। বিটোফেন তো দূরের কথা বাপের জন্মে কোন দেশী বা বিদেশী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধারেকাছেও যাননি। বিদেশী সঙ্গীতের ধারণা ওই জ্যাকসন আর হালফিলের ব্রিটনি স্পিয়ার্সে গিয়েও ফুল স্টপ। পরিচালক নিখিলেশ সোম অবশ্য আগরওয়ালের সাথে তাকেও এম.পি.থ্রিটা বাজিয়ে শুনিয়েছিলেন,কিন্তু.....

''সুতরাং বুঝতেই পারছেন এক্সপেকটেশনটা কি হাই থাকবে! আসলে কি জানেন,ইট ইজ ওয়ান অফ দ্য ফাইনেস্ট ওয়ার্কস ওয়ান কুড ইমাজিন,বিটফেনের নাম উঠলেই সেভেন্থ সিম্ফনির নাম উঠবেই।'' বলেই , হাওয়াতেই গিটার বা কিছু একটা তার যন্ত্র বাজালেন সঙ্গীত পরিচালক, কবির অবশ্য মনে হল, যেন হাত দিয়ে একটা নিটোল ফাঁস তৈরি করলেন তনুজ।
#


ততক্ষণে জ্যাম জমিয়ে দিয়েছি কলেজফেরত একগোছা ব্যাগের নাচোনকোদন।"রেড টিউব",খ্যাখ্যাখ্যা!দিব্যি মাগনায় লাইভ পর্ন বাবা!
ডোন্ট বি সিলি,দীপেশ। ইটস নট আ ফান আট অল।
এতগুলো মানুষ ক্যাবলা মেরে গেছে ,ফান নয় তী কি ব্রো?
রাজা রাজা!স্পিরিটটা দ্যাখ একবার ,ক্যান উই ডু ইট?
হোয়াই নট?আইভ দ্য গাটস। দেখিস নি,সেদিন জয়িতাকে কেমন মুখে উপর বলে দিলাম ,আমার এখন আর ওকে সেক্সি মনে হয়না .সো শি ক্যান মেরিলি গো টু হেল! হাহাহাহা! ও সব বাদ দে। কিছু ফুডস্টাফস নিয়েই ভিতরে ঢুকতে হবে ,নইলে
ইডেনের ভিতরের খাবারের যা হাল!ই বাবা!ভাবলে বমি আসে
আমার্।
সন্তুর খবর কি বে?
ও বোধহয় ফার্স্ট ইনিং দেখতে পাবে না। টিউশন হয়ে আসবে তো।তারপর....
শিটস!!!!
সম্ভবত কারো সানগ্লাস কালো পিচের উপর পরে একটা ধাতব শব্দ করলো।স্পাইক  থেকে চিল মারছে আলোর আয়না,পাশেই "দিন বাবু,দিন বাবু" ঐকতানে মিলেমিশে যাচ্ছে রিক্সার হর্নে নুলো ভিখারীটার অভ্যস্ত প্রলাপ । কবির মাথায়  তখন সেই অচিনপুরের স্বপ্নরাজ্য থেকে ছিনিয়ে আনা সেভেন্থ সিম্ফোণী পরিণত ভ্রুনের মত নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে।
#
"প্রথমেই বলেছিলাম এই অল্প মাইনেতে আমাকে শহরে নিয়ে আসার দরকার নেই ,কিন্তু কেউ শুনলে আমার কথা !কিছু বল্লেই বলবে -"তুমি এখনও গাঁঈয়াই রয়ে গেলে ,সুদীপা।''  বেশ আছি ,ভাল আছি ,আমি গাঁইয়া থাকলে কার বাপের কি ,শুনি?
বাবু তো সাতসকালে অফিস ছুটবেন।যত মরণ হয়েছে আমার ,এই রোগা ছেলেকে নিয়ে একবার হাসপাতাল ,একবার ক্লিনিক ,
আর পারিনা বাবা!তারপর মরা শহরে কথাবার্তা নেই জ্যাম লেগেই আছে।মর মর!
আধখানা ঘোমটার মধ্যে থেকে অভিশাপটা ঠিক কোনদিকে গেল,বোঝা গেল না।

ট্যাক্সিটা কিন্তু নাকবরাবর আসতে গিয়ে জ্যামে আটকে গেল। কবি সাধারণত পায়ে হাঁটতেই পছন্দ করেন কিন্তু আজ কলম বিক্রি করবেন বলে কথা দেওয়াতে পকেট একটু গরম। গ্লানির পাশাপাশি মনেও যে এট্টুএট্টু শৈশব আসেনি তা নয়!
নিখিলেশবাবু একথোকে দশ হাজার টাকা দিয়েছেন।( বাপরে বাপ ,কত্ত টাকা এদের কে জানে! )শাড়ি টারি একটা কিছু যাওয়ার পথেই কিনে নিতে হবে। অনেকদিন থেকে বৌটাকে কিছু দেওয়াই হয়নি। আর শ্রীগুরু মিষ্টান্নভান্ডার থেকে কিছু মিষ্টি ,চুলোয় যাক সব। ওই লিটল ম্যাগ আঁকড়ে থাকলে না খেয়ে মরতে হত। যা হয়েছে ভালই হয়েছে। জ্যাম কাটলে দত্তদার দোকান ,বেশ কিছু প্রুফরিডিঙের কাজ
বাকি পড়ে আছে। ওখান থেকে  স্ট্রেট  বাড়ি।
এদিকে একটা স্কুলবাসের ভিতর থেকে এই পৃথিবীর সমস্তকিছুকে ভেঙচি কাটছে লাললাল ইউনিফর্ম পরা চারাগাছ,ওয়াটার বোতলের দোলনের সাথে রাস্তায় বাওয়ালী করে বেড়ানো গুন্ডা ষাঁড়টার বেপরোয়া চালচলন রিলেটেড কিনা ভাবতে ভাবতেই কবি স্যূট করে ট্যাক্সির ভাড়াটা মিটিয়ে দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। রোদটাও যেন ক্যামন কমকম লাগছে। গ্রামের বাড়িতে প্রতিমার গায়ে কানি উঠে গেছে এতদিনে। মজা খালের আসেপাসে কাশে'র দৌরাত্ম্যে নীলচে আকাশও সাদার দৌড়ঝাঁপ ,শহরেও বিভিন্ন মিউজিক কোম্পানির শারদ বিজ্ঞাপনের পোস্টারে পোস্টারে ছয়লাপ। অথচ আজকের আগে এসব চোখেই পড়েনি তেমন করে।খুশিখুশি দুকলি গানও জিভের ডগায় এসে কুটকুট করতে লাগলো। নানা, গানের গলাটাও নিতান্ত মন্দ ছিলনা তো, অভ্যেস করলে হয়তো....
তাই বলে সেভেন্থ সিম্ফনি!উরে বাপস!
#

ট্র্যাফিক কন্ট্রোল ,ট্র্যাফিক কন্ট্রোল , কি ব্যাপার কি বলুন তো। এই অসময়ে জ্যাম কেন? জলদি ঝামেলা মেটান মশাই, ওই রাস্তা দিয়েই খাদ্যমন্ত্রির কনভয় যাবে। বি কুইক,বি কুইক।
আর বলবেন না, স্যার। এই সিজনটাই কুকুতগুলো যা জ্বালায় না, কি বলব আপনাকে! ওপেন রাস্তায় টিনেজ ছোঁড়াছুঁড়িগুলোর মত শুরু হয়ে গেছে। একসঙ্গে প্রায় দশ বারোটা ,স্যার, সরানো যাচ্ছেনা,স্যার, কিছুতেই সরানো যাচ্ছেনা। ইদিকে আমাকেও আবার বাবাকে নিয়ে একটু মেন্টাল হোমে যেতে হত, ধ্যুর ভাল্লাগে না, কিচ্ছু ভাল্লাগেনা।
আরে ওসব চালাকি ছেড়ে যেহক করে জ্যাম ছাড়ান । হাতে মাত্র কয়েকটা ঘন্টা বাকি। কুকুরের প্রেম দেখলে তো চাকরি থাকবে না ,মশাই, আপনার বাবার হোমে যাওয়ার কথা ভাবলেও না ।

#

প্রুফরিডিঙের কাজ শেষ হতেই রাত আটটা বেজে গেল।সেখান থেকে কেনাকাটা করে সরাসরি ঘরে ফেরার কথা ছিল। তারপর এট্টু ফুর্তিফার্তা। দত্তদার দোকান ছেড়ে বেড়িয়ে আসার মুখেই এল কলটা। ডিফল্ট রিংটোনে নোকিয়ার কাস্টম টিউনটা বাজা মাত্রই ছিটকে ফোনের দিকে ছুটে গেলেন কবি আর হবু লিরিসিস্ট দুর্বাদল ব্যানার্জি ,অন্যদিন সচারচর এত তাড়া থাকেনা তার একঘেয়ে ফোনকলগুলো রিসিভ করারকিন্তু আজকের ব্যাপারস্যাপার একটু স্পেস্যাল কিনা!
"হেলো ,আরে আমি বলচি ভায়া"ফোনে প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক নিখিলেশ সোমের গলা গমগম করে উঠল,
"মানে তোমাকে তো বলেছিলুম যে আমার মিউজিক ডিরেক্টর খুব কাজের ছেলে ,তো ব্যাপারটা হয়েছে কি ,ও জাভেদ আখতারের সাথে কথা টথা সব বলে ফেলেছ বুইলে,মানে একটা ইন্টারন্যাশনাল সাবজেক্ট ম্যাটার কিনা ,তাই শুধু বাঙলায় কম্পোজ কল্লে একটু পাতি ব্যাপার হয়ে যেত ,ভায়া। বুইলে কিনা,হিন্দি,বাঙলা আর চলনসই ইংরেজি মিশিয়ে একটা জবরদস্ত আন্তর্জাতিক ভাষা তৈরির প্লান আর কি!তাছাড়া ভেবে দেখলুম,প্রথম প্রজেক্টেই এত ভারিক্কি কাজ দেওয়াটা তোমার উপর এট্টু অবিচারও হয়ে যাচ্ছে।হেঁহেঁহেঁ ,তবে চাপের কিছু নেই টেই ,বুইলে। টাকাটা তিনচার দিনের মধ্যে ফেরত দিয়ে দিলেই চলবে । তাছাড়া তুমি দত্তের পরিচিত মানে আমারও ঘরের ছেলে ঠিক কিনা?...হাহাহাহাহা!

#

কবি হেঁটেহেঁটে বাড়ি ফিরছেন। অদ্ভুত একটা ভ্যাপসা গরম আর অন্ধকার মিলিয়ে বেশ গুমোট পরিবেশ। অজস্র লোক ,যাদের মধ্যে অধিকাংশই অল্পবয়স্ক তরুণতরুণী ,হৈচৈ করতে করতে ফিরছে,আপাদমস্তক তিরঙায় ঢাকা এক তরুণকে গালে ত্রিবর্ণরঞ্জিত  তরুণী আবেগের বশে জড়িয়ে ধরে কামড়ানোর মত করে শব্দ করে চুমু খেলো।ওদের গাড়ির পাশেই জ্যামের অঙ্গুলীহেলনে ব্রেক কষলো মর্গফেরত একটা আম্বুলেন্স ,জানলার অর্ধেকটা নামানো কাঁচের ফাঁক দিয়েইকবির চোখ পড়ল একটি ঘোমটা পড়া হাফগাঁইয়া টাইপ বৌ অন্য এক চলনসই পুরুষের কাঁধে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদেই  চলেছে ।স্কুটির উপর দিব্যি খুনসুটি করছে মেরুন রঙের টপ আর ঈষৎ হলদে একটা ব্র্যান্ডেড শার্ট। 
তরমুজওয়ালা বুড়ো আধাশোওয়া আধাবসা অবস্থায় বিড়ি ফুঁকছে আর কন্টিনিউ বিড়বিড় করে কি যেন বলছে!
সিগন্যালের লাল আলোর মানুষ,বেমক্কা লম্বা জ্যামে হেডলাইটের দাপাদাপি, কবিরও চোখ জ্বালা করছে। এই একদিনেই যেন অনেক বয়স বেড়ে গেছে। শরীরটাও ভারিভারি লাগছে, ক্লান্তিতে চোখ বুঝলেন কবি।

হঠাত তীব্র হর্নের আওয়াজে ঘোর ভাঙতেই দেখলেন আলোটা সবুজ হয়ে গেছে। হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে সামনে যাওয়ার। সুখ দুঃখ হাসি আনন্দ সমেত সমস্ত কিছুই ছুটে বেড়িয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে থেকে।টিনেজার ছেলেমেয়েদেরমাদকতাময়  বিজয়োল্লাস,চাষাবৌটির দীর্ঘস্থায়ী গোঙানি আর এই তরমুজওয়ালার মৃদু বিড়বিড়ানি মিলেমিশে কেমন যেন একটা অলীক ঐক্যতান,খুউব চেনা ,অত্যন্ত প্রিয় কোন অলৌকিক সৃষ্টি...
অনেকটা সেই নিখিলেশ সোমের স্ট্রিরিওফোনিক হোমথিয়েটারে
শোনা বিটোফেনের এম.পি.থ্রি-র মতো।