প্রবাদ প্রবচন কি মেয়েদের তৈরী?
বীরভূমের প্রচলিত প্রবাদ প্রবচন নিয়ে খানিকটা দৌড়ঝাঁপ করার পর এই কথাটাই আগে আমার মাথায় এলো। কেন এলো , সেটাও বলছি। তবে আগে সো কল্ড "শ্লীল" লোকজনদের বলব এই পোস্ট থেকে দূরে থাকতে। কারণ শ্লীলতা'র মত আপেক্ষিক বস্তু আর যায় হোক ভাষার বিবর্তনে কোন সাহায্য তো করেই না বরং বিস্তর প্রতিকূলতার সৃষ্টি করে। আর এই প্রবাদ প্রবচনগুলো যে যুগে জন্ম নিয়েছে , তখন ভাষার শ্লীলতাহানি নিয়ে সমাজ এতটা শুচিবাইগ্রস্ত ছিল না।
যে দুটো কথা বল্লাম; সেগুলো যে আমার স্বকপোলকল্পিত নয় তারজন্য কয়েকটি উদাহারণই যথেষ্ট …
"অগত্যায় লাতি ভাতার।"
আক্ষরিক অর্থে অগত্যায় পড়ে নিজের দৌহিত্রকেই ভাতার( সংস্কৃত ভর্তাথেকে আগত , যার অর্থ স্বামী বা মালিক) রুপে স্বীকার করে নেওয়া। তবে পরোক্ষভাবে
প্রবাদটি নারীপুরুষনির্বিশেষে একজন ব্যক্তির চরম অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়ে হীনতর কোন কর্মে লিপ্ত হওয়াকেই বোঝায়। লক্ষ্য করুন , পরোক্ষভাবে যদিও প্রবচনটি নারীপুরুষনির্বিশেষে সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য কিন্তু এর প্রত্যক্ষ বা আক্ষরিক অর্থ কিন্তু নারীর দিকেই ইশারা করছে।
এরম আরো অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেখানে এই "ভাতার" শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন ধরুন ," যে দুখ কে সেই দুখ , (আমার) ভাতার ধরি কি সুখ! '' কিংবা "নাং (প্রেমিক ) এর আশায় ভাতার মারি" ইত্যাদি ইত্যাদি। কোথাও নারীর অসহায়ত্ব , কোথাও অনুশোচনা , কোথাও নিজেকেই বিদ্রুপ করা , কোথাও আবার এক নারীর প্রতি অন্য নারীর নির্ভেজাল কটুক্তি।
যেমন ধরা যাক "এক পয়সার তেঁতুলবিচি , পোঁদ করছে খিচিবিচি। " অর্থাৎ আকস্মিক ধনলাভের পর আত্মঅহঙ্কারপ্রসুত অস্বাভাবিক আচরণ। একই অর্থবহনকারী একটি বহুপ্রচলিত প্রবাদও আমাদের সো কল্ড শ্লীল সমাজে প্রচলিত আছে। "নির্ধনের ধন হলে দিনে দেখে তারা।"
আর নারীর প্রতি নারীর বিশেষ করে বৌ শ্বাশুড়ী বা ননদ বৌদি/বৌমা'র চিরাচরিত বিদ্বেষের কথা তো সর্বজনবিদিত। আর সেই বিদ্বেষের গর্ভেই জন্ম নিয়েছে না জানি কত এইজাতীয় ধনরাশি!
বৌমাকে ঠাট্টা করে শ্বাশুড়ীর বাক্যবাণ " পোঁদে নাই ইন্দি(জল) ভজো রে গোবিন্দি ,অথবা "বাবার জন্মে নাইকো গাই ,
চালুন নিং দুহাতে যায়!' , কিংবা " কত কি হয় সাধে , পিদিম জ্বেলি পাদে! " , কিংবা "সেই তো মল খসালি , তবে কেন হাসালি!" ইত্যাদিইত্যাদি।
কিংবা বৌয়ের বাপের বাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থাকে ব্যঙ্গ করে "হাঘরের বিটি রে ভাতঘরে পোলো(পড়লো) একথাল ভাত দেখি নেচিকুদি মোলো!" , কিংবা জনৈক "পদী " নাম্নী কিশোরী বধু'র রন্ধনজনিত অক্ষমতাকে বিদ্রুপ কর "কত রঙ্গ দেখালি পদী , অম্বলে দিলি আদা!"
তা যে যায় বলুন না কেন, এইসব প্রবাদ প্রবচনের গর্ভেই তত্কালীন সমাজে পণপ্রথা ও ততজনিত কারণে নববধূকে যে দূর্ভোগ পোয়াতে হতো , তা এইসব প্রবাদ প্রবচনের মধ্যেই স্পষ্ট। অবশ্য সেই পরিস্থিতি যে এখনও খুব একটা উন্নতি হয়েছে তা কিন্তু নয়। কার
ণসেই ঐতিহ্য মেনে এখনও " অম্বলে আদা " দেওয়ার মত ঘটনার জন্যে নববধূকে মানসিক নির্যাতন এমন কি কিছুকিছুক্ষেত্রে শারীরিক উত্পীড়নও সহ্য করতে হয়।
অবশ্য তত্কালীন বধূরাও যে বৃদ্ধা শ্বাশুড়ীকে কিংবা বয়স্ক ননদকে পাল্টা দিতেন না এমন নয়। তাদের বাক্যবাণও তীক্ষ্ণতা বা রসঘনতার দিক থেকে খুব একটা পিছিয়ে ছিল না।
প্রথমেই উল্লেখ করা "যে দুখ কে সেই দুখ, (আমার ) ভাতার ধরি কি সুখ?" কিংবা শ্বাশুড়ীকে শুনিয়ে শুনিয়ে সমবয়সী প্রতিবেশিনীকে নিজের অবস্থার এইভাবে বর্ণনা দেওয়া " যে আমার বিহ্যা(বিয়ে) তার দুপায়ে আলতা!"
কিংবা "শ্বশুরবাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থা আর তারজন্যে নিজের কষ্টভোগ'কে তুলে ধরার জন্যে "দূর থেকি শুনল্যাম জগঝম্প বাজনা , কাছে এসি দেখল্যাম লাঠি আর লাদনা!"
এ তো গেল " ফর ওউমেন বাই ঔমেন " টাইপের সরলীকরণ।তাছাড়াও বহু বিষয়ে বহু প্রবচন বীরভূম তথা বাঙলার কোল আলো করে আছে। তাদের কোনোটাই অভিজ্ঞতা থেকে লব্ধ সাদারণ জ্ঞান , কোনোটাই নিছকই এক সম্প্রদায়ের অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ, কোনোটা আবার ভীষণ ব্যতিক্রমী।
যেমন ধরুন
"কালো বামুন, কটা মাল, কয়রাচোখ্যা মুসলমান
ঘরজামাই আর পোষ্যপুত্র সব শালা সমান"
এইসব প্রবাদ যদিও একটা নির্দিষ্ট একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রচিত , এবং এর সত্যতা নিয়েও রীতিমতন সন্দেহ আছে কিন্তু একই সাথে এখন কোথাও কোথাও যে একে বেদবাক্যের মত মনে করা হয় এটাও সত্য। নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বদগুণের উল্লেখ করে আরো অজস্র প্রবাদ প্রবচন রচনা করা হয়েছিল , যাদের মধ্যে -
" মুখুটি কুটিল বড় , বন্দ্যঘটী সাদা
আর চট্ট হারামজাদা"
কিংবা -
"তেঁতুল হয়না মিষ্টি
নেড়ে হয়না ইষ্টি।"
কিংবা -
"পুরুষের ভালোবাসা
মুসলমানের মুরগি পোষা।"
এরকম আরো অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। এত গেল একে অপরকে কটুক্তি করে রচিত প্রবচনগুচ্ছ। এবার যে ব্যাপারটা আলোচনা করব সেটাই আমাকে সবচেয়ে বেশী চমকে দিয়েছে। তত্কালীল মানুষ ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলেন এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু যদি দেখেন কর্মক্ষমতায় বিশ্বাসী মানুষ তখনও ঈশ্বরকে হয়ত একেবারে উড়িয়ে দিতে পারেন নি , কিন্তু তাকে যে বিশেষ পাত্তা দিতেন না সেটা স্পষ্ট। নাহলে এরকম প্রবচন রচিতই বা হলো কিভাবে?
"হে নারায়ণ , তরাও তরাও(ত্বরাও ত্বরাও)
হাত পা লড়াও, হাত পা লড়াও(নড়াও)
অর্থাৎ ঈশ্বরের কাছে যখন বলছি -হে ঈশ্বর, আমাকে এই সংসারসমুদ্র পার করো। ঈশ্বর বলছেন
- দিব্যি তো হাত পাওয়ালা লোক হে তুমি। হাত পা নড়াও। নিজে চেষ্টা করে পার হও, বাপু, আমি ওসব ক্যাচালের মধ্যে নেই।
"হরি বলো মন রসনা, খেঁজুরগাছে পোঁদ ঘোঁষো না
ঘষতেঘষতে বেরোবে রক্ত , তবে জানব তুমি হরিভক্ত। "
…চলবে …