নিশিকাকিমার মেয়ে শিউলিকে দেখতে এসেছে সাঁইথিয়ার এক পার্টি। কাকিমা সহায়সম্বলহীন বিধবা। কাজেকাজেই সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়েছিল পাড়ার ছেলেমেয়ে মানে আমাদের ঘাড়েই। প্রতিবেশী নবুজ্যেঠুদের ঘর থেকে সুদৃশ্য কাশ্মিরি কম্বল এনে বড় ঘরটায় পেতে দেওয়া, একটা টেবিল ফ্যানের ব্যবস্থা করা, মহাদেব মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে টুকটাক কেনাকাটা , কনে সাজানো, এমন কি যে জানালার পাশে বসে কনে দেখানো হবে তার বাইরে থেকে কনে দেখা আলোর জন্যে সূর্যের আলোর অভাবে অল্টারনেটিভ আলোর ব্যবস্থা করা , মানে এ টু যেড সবই আমাদের দায়িত্ব, আর কি।
পাত্রপক্ষ বলতে বছর চল্লিশের এক নাদুসনুদুস ভদ্রলোক, আর তার চেয়েও বেশী নাদুসনুদুস গোটা তিনেক বন্ধু।গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে তাদের পা-ধোওয়ার জন্যে জল দেওয়া হলো। খানিক পরেই ছিমলি গিয়ে ওদের সামনে কোল্ড ড্রিঙ্কস , তারপর পরম্পরা মেনে মিষ্টিসিঙ্গারানিমকি সুসজ্জিত প্লেট নামিয়ে দিয়ে এলো। ওদিকে পাশের ছোট ঘরটাতে তখন শিউলিকে ভদ্রস্থ করে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মিনুবৌদি।
পাড়ার গুরুজনরা মানে ঠাকুমা কাকা কাকিমা বৌদি মিলে প্রায় আট দশ জনের টীম বাইরের বারান্দায় বসে ফিসফিস করছেন। বাপি'দা বরাবরই একটু বেশী স্মার্ট। একফাঁকে কখন স্যাট করে ঘরে ঢুকে পাত্রপক্ষের সামনে এক প্যাকেট উইলস ফ্লেক্ সিগারেট আর মৌরি নামিয়ে দিয়ে চলে এসেছে।
ঠিক তখনই নবুজ্যেঠু এলেন। এই ভদ্রলোককে জেঠ্যু বলা নিয়ে যদিও আমি একটু কনফিউজড তবুও কিন্তু জেঠ্যুই বলি। শুধু আমি কেন , বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনিও জ্যেঠু বলতেন। বয়স আশি নব্বই হবে। একশ দেড়শ হওয়াও বিচিত্র নয়! তবে বয়সের পক্ষে যথেষ্ঠ মজবুত। লাঠি নিয়ে একটু কুঁজো হয়ে হাঁটেন বটে কিন্তু এখনও চশমা নেন নি। কন্ঠস্বরেও বার্ধক্যজনিত কোন বিকৃতি নেই। ছেলেপুলে নেই , স্ত্রীও বেশ কয়েকবছর আগেই ধরাধামের মায়া কাটিয়ে বেশ ধুমধাম করেই চলে গেছেন। নবুজ্যেঠুই কেবল পঞ্চাশ ষাট বিঘে জমিজমা আর মহেঞ্জোদারো মার্কা একটি পাকা দালান নিয়ে প্রতিবেশীদের হিংসের মুখে ছাই দিয়ে ঠুকঠুক করে ব্যাটিং করে যাচ্ছেন তো যাচ্ছেনই।
তবে হ্যাঁ , জ্যেঠু কিন্তু লোক মন্দ নন। মানুষের পাশে দাঁড়ানো , সত্ পরামর্শ দেওয়া ,এমন কি প্রয়োজনে নিজের মরাই ভেঙে ধানচাল দিতেও কার্পণ্য করেন না বলে শুনেছি।
দোষ বলতে ওই মুখের উপর আনখাই রকমের স্পষ্ট কথা বলা। তবে সেই স্পষ্টকথা যে কি চিজ তা আমরা সেদিন আবার নতুন করে টের পেলাম।
বসার ঘরে পাত্রপক্ষের সদস্যরা কেউ তখন মিষ্টির প্লেটে নিমগ্ন , কেউ আবার সেই প্রাথমিক স্টেজ পার হয়ে মৌরি চিবুতেচিবুতে জুত্ করে সিগারেট ধরিয়েছে।
নবুজ্যেঠু এসেই আলেকজান্ডারের মত ধাঁ করে পাত্রপক্ষ যে ঘরে বসেছিল সেই ঘরে ঢুকে গেলেন। অন্য কেউ হলে একটা গলা খাঁকারি মেরে সেখান থেকে কেটে পড়তো। কিন্তু এসব বাহুল্য নবুজ্যেঠুর নেই। ঘরে ঢুকেই স্যাট করে একটা একটা চেয়ার টেনে নিয়েই মারকুটে সারদা পন্ডিতের মত মুখ করে জ্যেঠু জিজ্ঞেস করলেন
-তা বাবা'দের মধ্যে পাত্র কোনজন?
-এই যে সার, আমি , পাত্রের নিরাসক্ত উত্তর।
-তা বাবাজীবনের নাম কি?
গন্ডেপিন্ডে মিষ্টি গিলে মুখ টকটক লাগছে পাত্রের। সিগারেটে দুটো টান মারার জন্যে ভিতরটা ছটফট করছে কিন্তু নেহাত্ই সামনে এই বুড়ো বসে আছে বলে ধরাতে পারছে না। তার উপর আবার দারোগার মত এনকোয়ারি ,
-সাধন , সাধন দত্ত , মুখে পচা বাদাম পড়ার বিরক্তি নিয়ে উত্তর দিলেন পাত্র।
বামপাশে এক বন্ধু অবশ্য একটু আগেই সিগারেট জ্বালিয়ে ফেলেছে , এখন সেই ধোঁয়া লুকানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টায় ম্যাজিসিয়ানদের মত করে অদ্ভুতভাবে হাত নাড়াচ্ছে। অথচ এই ত্যাঁদড় গাঁইয়া বুড়ো সামনে থেকে নড়বার লক্ষণই দেখাচ্ছে না।
-তা বলি , বাবা'র বয়স কত? - আবার প্রশ্ন? উফফফ! এ
শালা তো দেখছি জ্বালিয়ে মারলে! অশিক্ষিত গ্রাম্য বুড়োকে একটু সমঝে দেওয়ার জন্যে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে বিবেকানন্দের মত কেত্ মেরে সাধনবাবু চোস্ত ইংরেজিতে বললেন - থার্টি প্লাস।
কথাটা বলেই মনেমনে একচোট হেসে নিল সাধনবাবু। শালা বুড়ো ভাম এবার একটু চুপ মারবে! আর যায় হোক এই ইংরেজি বুকনির জবাব এই গেঁয়ো বুড়োর কাছে থাকবে না নিশ্চয়।
-কতো প্লাস , বাবাজীবন?
নবুজ্যেঠুর কন্ঠস্বরে শার্লক হোমসের অনুসন্ধিৎসা।
এতক্ষণ যে আত্মপ্রসাদের সাগরে ডুবকি দিয়েছিলেন সাধন , সেখান থেকে এক ধাক্কায় কে যেন তাকে বাস্তবের চোরাবালিতে আছড়ে ফেলে দিলো। হাঁকপাঁক করে বললো - অ্যাঁ! আ আ মাকে ক-ক-কি- কিছু বলছেন?
-হ্যাঁ মানে জিজ্ঞেস করছি থার্টির সঙ্গে কত প্লাস দেবো, বাবা?
চাতরা গনেশলাল বিদ্যামন্দির থেকে তাদের ব্যাচের একমাত্র আই.এ পাস করা নবুজ্যেঠুর কন্ঠস্বর শোয়েব আকতারের ইয়র্কারের মত সোওওজা এসে আছড়ে পড়ল।
ঘরের মধ্যে শ্মশানের নীরবতা। সপারিষদ সাধনবাবু বুঝে উঠতে পারছিলেন না এই প্রশ্নে তার রেগে যাওয়া উচিত্ নাকি হেসে ফেলা , নাকি শেষমেষ কেঁদেই ফেলবেন!
হঠাৎ "কোঁত্খরকফরাত্ " বা ওই জাতীয় কটা আওয়াজে নিস্তব্ধতা ভাঙলো। এই অভাবনীয় পরিস্থিতিতে গলায় সিগারেটের ধোঁয়া আটকে বন্ধুর চোখমুখ দাঁড়িয়ে গেছে। কাশতেকাশতে চোখ থেকে জল ঝরতে শুরু করেছে। থতমত খেয়ে বন্ধু যেই সিগারেটটা নিচে গুঁজে নেভাতে যাবেন , অমনি নবুজ্যেঠুর স্পষ্টবাদিতার ঝোলা থেকে আকস্মিক বজ্রপাতের মত বের হয়ে এল নবতম পাশুপাত্ ,
-ওই সিগারেটটার দাম মেরেকেটে তিন চারটাকা তো হবেই , নাকি? আর আমার এই কাশ্মিরি কম্বলখান
দেখছো , সেবার পোদ্দারদের বড়ছেলে ,মিলিটারিতে কাজ করে , তাকে দিয়েই আনিয়েছিলেন , বুঝলে কিনা , কেনার জন্যে ট্যাঁক থেকে নগদ তিন হাজার খসেছে। একসঙ্গে সিগারেট আর কম্বল দুটোকেই নষ্ট করে কি লাভ, বাপধন? জল খেয়ে এট্টু সামলে টামলে নাও , তারপর নাহয় …
তারপর কনেদেখার এপিসোডটা আর তেমন জমেনি। হুঁহুঁনানা করতে করতেই মিনিট পনেরোর মধ্যেই শিউলিরানীর ত্রয়োদশতম পরীক্ষা শেষ হয়েছিল। আরেক দফা চা পানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে হনহন করে গাড়ির দিকে হাঁটা দিয়েছিলেন সপারিষদ সাধন দত্ত।
-আমরা বাড়িতে গিয়ে আলোচনা করি , তারপর ফোন করে জানাবো, গাঁইগুঁই করতেকরতে গাড়িতে উঠে যাওয়ার আগে এটাই ছিল থার্টি প্লাস সাধন দত্তের পার্টিং ওয়ার্ড।
তবে সে ফোন যে আর কখনোই আসেনি সেটা বলাই বাহুল্য!
#পীযূষ কান্তি বন্দ্যোপাধ্যায়
No comments:
Post a Comment