Pages

Sunday, 22 June 2014

লাইসেন্সড টু কিল …

+লাইসেন্সড  টু কিল+

ফেসবুকে বিচরণকারীদের লেখালেখির জন্যে আলাদা কোন ইন্সপিরেশনের দরকার হয়না,কারণ এটা নিজেনিজেই একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ জগত।গল্প তো খুব পাতলা বস্তু বস ,দেখার চোখ থাকলে রীতিমতন হেলদি টাইপের মহাকাব্যও নামিয়ে দিতে পারেন। কি নেই ,বলতে পারেন?নাট্যসাহিত্য বা কাব্যসাহিত্যের সমস্ত উপাদান পরতেপরতে জমানো আছে ,ট্র্যাজেডি ,কমেডির মত বুড়ো ভাম কিংবা মুক্তগদ্যের মত হালফিলের ছোকরা সবাই "প্রেজেন্ট স্যার"

আর চমক? সেতো নিত্যদিনের সাধনসঙ্গিনী ,যতোটা নিতে পারবেন ,তার চেয়েও আপনাকে বেশী চমকে দেবে যেমন পাড়ার শনিপুজার চাঁদা না পেলে বেপাড়ার রিটায়্যার্ড বুড়োকে চায়ের দোকানে পাতি চ্যাংড়াদের গ্রুপ চমকে দেয়।
এবার সরাসরি ডেমো দিই ,নাহলে ফেসবুক মহিমা ঠিকঠাক সেঁধোবে না।
আপনি একজন সম্মানিত বয়স্ক ,লেখালিখির সুত্রেই কোন বছর পঁচিশের এক ছোকরার সাথে আলাপ ,ভাবলেন ,দিব্যি লিখছে ছেলেটা ,একটু শিখিয়েপড়িয়ে নিতে পারলে মন্দ হয়না। আকস্মিক বজ্রপাতের মত দেখলেন সেই আপাতনিরীহ "বাচ্ছা ছেলে"ই আপনার আঁতুড়ি বের করে নিয়ে প্রকাশ্যে জাগলিং খেলছে। ইনবক্সে এসে নিজস্ব বানানো প্রকরণে  বলে যাচ্ছে ,আপনার কবিতার  ছাতার কোথায় কতোখানি ফুটো! সারপ্রাইজ!

আবার ধরুন ,আপনি একজন সদ্য কুড়ির ঘরে পা দেওয়া ফাটাফাটি রকমের প্রোফাইল পিকচারের মালকিন। বাহাত্তুরে যাওয়া ,জ্যেঠুর বয়সী কেউ একজন এসে আপনার ইনবক্সে জ্ঞানদানের ছুঁচ হয়ে ঢুকলো। হাজার অস্বস্তি সত্বেও বাপতুল্যকে যখন দাদা ডাকাটা প্রায় রপ্ত করে ফেলবেন ফেলবেন মনে হচ্ছে ,তখন আবার গল্পে আনোখা টুইস্ট!  বয়সের দোষে প্রস্টেট আর ব্রেন দুটোই ঢিলে হয়ে গেছে। আবেগ সামলাতে না বলেই ফেল্লেন ,
"তুমি খুব বিপ বিপ বিপ ...,আই হাভ স্টার্টেড টু বিপ বিপ বিপ ,আমাকে দাদা নয় বরং নাম ধরেই ডেকো!"  ভালোথাকার মা কি আঁখ করে আপনি এখন হয়তো চ্যাটবক্স না খুলে পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন। সারপ্রাইজ! সারপ্রাইজ!
দ্যাটস ফেসবুক ফর ইউ ডুড!হাহা! এনিথিং ক্যান হ্যাপেন হিয়ার!

এত গেল সুন্দর ত্বকের গোপণ রহস্য। এবার খানিক বাইরে উঁকি মেরে দেখুন। শালা!যেন মিস ইউনিভার্স কন্টেস্ট চলছে। নটি নোটিগুলো ফি কেশন সহ নটী বিনোদিনী মত হেলতে দুলতে এসে  একসাথে যখন. সরু মাঝারি ও মোটা গলায় "খোল খোল দ্বার ,রাখিও না আর " গাইতে শুরু করে তখন কি চিত্তির কি চিত্তির!
কিংবা ধরুন ,পাড়ার মদনবাবু আপনার সাথে ধাক্কা লাগলেই মুখ তুলে দুটো কথা বলেন না ,কারণ ওর সন্দেহ আপনির ওর বৌয়ের প্রতি অনুরক্ত কিংবা ভাইসভার্সা ..কিন্তু ফেসবুকে কোন ডে"তে ঊইশ করতে বাদ রাখেন না। একদিন হয়ত আপনি ক্রনিক আমাশায় কষ্ট পাচ্ছেন ,একবার ঠাকুরঘরে গিয়ে টুক করে ফাইনলেগের দিকে ঠেলে দিয়েই  ফেসবুকের ওয়ালে এসে স্কোর লিখে যাচ্ছেন। আচমকা কিক বক্সারের রাইট পাঞ্চের মত ইনবক্সে মদনবাবুর  টরেটক্কা " হোয়াটস আপ"
আপনি রামছাগল রামছাগল মুখ করে একটু সিম্প্যাথির আশায় সমস্ত ইনোসেন্স চেঁছেমুছে বল্লেন "আর বলবেন না ,দাদা ,বড্ড আমাশায় কষ্ট পাচ্ছি ,সকাল থেকেই হেগে যাচ্ছি"
"বেস্ট উইশেস ,হ্যাপি হাগা ডে"

বুঝুন!!

আর ট্যাগিং?
ট্যাগিং তো নয় যেন রয়াগিং,কেউ বৌয়ের গাল ফাল টিপে উম্ম হম্ম চুম্ম টাইপের মুখ করে ছবি তুলে পোস্ট করেই আপনাকে নির্দ্বিধায় ট্যাগিয়ে দিলেন,কেউ সাতসকালে উঠে কুকুরের বাচ্চা বা গোলাপ ফুলের কুঁড়ি ,
একটু বেশীরকমের রসিকরা তো ছেঁড়া আন্ডারপ্যান্ট ,স্যান্ডো গেঞ্জি কিংবা ক্ষয়াটে চপ্পলের ছবিতেও আন্তরিক ট্যাগ দেন। ট্যাগের ভারি ব্যাগেজ সরাতে সরাতে আপনার অন্তরে কি পরিমাণ যন্ত্রনারা খিস্তিকীর্তন শুরু করে ,সেটা তাদের কাছে বলিপ্রদত্ত পাঁঠার হাঁড়িকাঠে যাওয়ার পূর্ব মুহুর্তের চিত্‍কারের ন্যায় বাহুল্য বলেই পরিগণিত হয়।
আর সবচে বেশী গর্ভযন্ত্রণার ব্যাপার হয় দিনে যদি ধারাবাহিকভাবে গোটাদশেক কবিতায় আপনার নাম ট্যাগিয়ে দেওয়া হয়। আপনি আড়াল খুঁজছেন কিকরে এই কাব্যোঘাতের হাত থেকে পরিত্রাণ পাবেন কিন্তু বাকি চামচবর্গ তখন ভয়ংকর উত্‍সাহের সাথে উফফ! অসা!
ইত্যাদি শব্দের সাথে যন্ত্রনার কুচি নিরন্তর ক্ষেপণ করে যাচ্ছেন। মাইরি বলছি পার ডে যদি বিশ পঁচিশটা করে "অসাধারণ " কবতে পড়তে হয় ,তবে অসাধারণ কথার মূল অর্qাড় ,নিজের জন্মদাতার নামও ভুলে যেতে বাধ্য হবেন।
তারপর আছে বিভিন্ন আঁতেলমার্কা পোস্ট।হনোলুলুর শ্রেনীসংগ্রাম ও শশা কিংবা বাংলা কাব্যসাহিত্যে কুমীরের প্রভাব ,
কিছু নারীবাদী স্ট্যাটাস ,যেমন ধরুন -মেয়েরা আর পুরুষদের মনোরঞ্জনের জন্যে সাজবে না (কেন সাজে তাকি আর জানা নেই!বলতে গেলেই ক্যাচাল ,অগত্যা)
কিংবা রুটি তৈরির জন্যে যে বেলুন ব্যবহার করা হয় সেটা আর কুতুবমিনারও নাকি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধি কারণ সেটা নাকি ইয়ের মত দেখতে!

কোনকোন দোস্তোদের আবার দেশপ্রেম দেখানোর একমাত্র মাধ্যম এই জুকারের যন্ত্র। নিজের দেশকে ভালবাসা মানেই প্রতিবেশীর দেশকে টেনে গালাগালি করা আর কি! বাড়র পাশের মানুষ মরলো কি বাঁচলো দেখার সময় কোথায়? তাছাড়া কুম্ভীরাশ্রু  সেখানে প্রয়োজনীয় ব্রাভো কিংবা ক্লাপেও বঞ্চিত যে।
দু একজন তো সমস্ত হদ পার করে নিজেই কবি ,নিজেই প্রকাশক ,বিজ্ঞাপনদাতাও তিনি। তার বই কিকি কারণে কিনবেন ,মানে তাতে কতখানি মাল্টিভিটামিন ,কতখানি সান প্রোটেকটিভ লোশন ,কতোখানি জাপানী তেলের ধামাকেদার মিশ্রণ আছে "গদগদচিত্তে দন্তপাটি বিকশিত করিয়া" ব্যাখ্যা করে চলেছেন।
বিষণ্ণ বিষয়হীন বেয়াদপের মত আপনি তার স্ট্যাটাসে গিয়ে পিঠ থপথপ করে আসতে পারেন বা বঞ্চিত বাঞ্চোতের মত খিস্তি করতে পারেন কিন্তু এড়িয়ে যেতে যে পারবেন না ,সে গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি।

সকালসকাল এইসব থান ইঁটের মত স্ট্যাটাস বুদ্ধিবৃত্তির কপালে এসে ঠাঁই করে লেগে একেবারে ফুটো করে দেবে। আপনি ভাবতে থাকবেন ,লোকে এত জানে কিকরে? আর এত জ্ঞান নিয়ে ঘুমই বা হয় কিকরে?  ততক্ষণে হয়ত বাংলা সাহিত্যের বিকাশ
কিংবা মঙ্গোলিয়ার অপুষ্টিগত সমস্যা সদ্য পোস্টিত কোন "অওসাম" ললনার বুকের এট্টু উপরে তিনকোনা করে কাটা হিল স্টেশনে  এসে মৌরসীপাট্টা গেড়েছে।

তারপর আছে নানান "apps"এর অপকীর্তি। আপনি তলেতলে কাকে লাইন মারার ফন্দি আঁটছেন কিংবা ভিতরেভিতরে কে আপনার রসে রসেছে ,কিংবা আপনি কি কারণে এত আকর্ষণীয় বা আপনার আন্ডারওয়্যারে কটা ফুটো আছে ,আপনার নাম মদন বা ঘনশ্যাম হলে কিংবা মন্দোদ্যরী বা জেবউন্নিসা হলে ক্যামন হত ইত্যাদি শার্লক হোমসের ঠাকুর্দা টাইপের লেবার পেইন।

মানেকথা হল ,এখানে সবই আছে। দুর্গাপূজা ,স্বাধীনতা দিবস ,ঈদ ,স অ অ অ ব। প্রেমিক প্রেমিকার বিমূর্ত কাঁইকিঁচির আছে ,বিপ্লবের সিংহগর্জন আছে ,দুষ্টের দাস্তান আছে ,সুন্দরীর শু এর বিজ্ঞাপন আছে ,ধর্মের ধমক আছে ,নাস্তিকের নারা আছে ,পলিটিশিয়ানদের পলিগ্যামি আছে ,মাগছেলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উইকএন্ডে পিস আটেক মাটন উদরস্থ করার পর জম্পেশ করে বিড়ি জ্বালিয়ে দেশলাই কাঠি দিয়ে দাঁট খুঁটতেখুঁটতে যেমন "আর বাল ,বেঁচে থাকতে ভাল্লাগে না" বলে ঢেকুর তোলার মত ফেসবুকে থেকেই ফেসবুকে'র মা কি'বলে অজস্র আফসোসও আছে।

কিন্তু যখন ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই টিনেজ একটা স্ট্যাটাস এসে আছড়ে পড়ে ,"আরে বস ,বলিস না ,নেট ছিলনা আর লোডশেডিং ও ,তাই কাল রাত্রে আসতে পারিনি। অগত্যা বাড়ির লোকদের সাথেই কাটালাম। বাড়ির লোকগুলোও তো ভালোই বে ,এতদিন বুঝতে পারিনি। ভাবছি ,মাঝেমাঝে ওদের সাথেই কাটাবো।"

তখন মনে হয় ,অগত্যাই ঘাসপাতা বা  কাঁচা মাংস হয়তো খাচ্ছি ,কিন্তু এখনো পুরোপুরি জঙ্গলে যেতে পারিনি। খানিকটা মানুষ আমরা এখনো রয়েই গেছি।

আপনি কি বলেন?

No comments:

Post a Comment