Pages

Saturday, 21 June 2014

ছড়া লেখা দিনের পর দিন কমে যাচ্ছে কেন (একটি ময়নাতদন্ত)

ছড়ায় ছড়ানো …

ছড়াকে যদি সাহিত্যের মৃতপ্রায় ধারাগুলোর অন্যতম বলি, মিথ্যে বলা হবে কি?  বোধহয় হবেনা! 
অথচ এই আন্তর্জাল সাহিত্য বিপ্লব আর তার সাথে ব্যাঙের ছাতার মত ছোট বড় মেজো বিবিধ পত্রপত্রিকার দাপিয়ে বেড়ানোর সময়ে এমন একটি ফলাফল নিশ্চয় কাংখিত ছিল না।

তাহলে …?

এই অপ্রিয় প্রশ্নের উত্তরও এই বারোয়ারী সাহিত্যচর্চার গর্ভেই লুকানো আছে। একটা সময় ছিল যখন কবিতা লেখার প্রথম শর্তই ছিল ছন্দ এবং অন্ত্যমিল। সংগতকারণেই পাড়ায় পাড়ায় শনিপুজোর মন্দিরের মত কবিতার ঠেক গড়ে ওঠেনি। কঠিন ছিল ভাব ও ভাষার মাধুরীটুকুকে উপযুক্ত আঙ্গিকের বাঁধুনীতে বেঁধে পরিবেশন করাও। কালের নিয়ম মেনেই আর পাঁচটা শিল্পকর্মের মত কবিতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এলো। শুরু হলো গদ্যছন্দে লেখালেখির অভ্যাস। সেটা ভালো হলো কি মন্দ , সে প্রশ্নে যাওয়া অবান্তর। ছন্দের বাধানিষেধ ভেঙে যাওয়ার ফলে কবিতার অঙ্গন আরো বেশী করে ছাপোষা মানুষদের জন্যে উন্মুক্ত হলো কিনা,
অন্যান্য পারফর্মিং আর্টের ক্ষেত্রে যেখানে টু লার্ন, টু প্র্যাকটিস আর টু  ডেডিকেট  প্রয়োজনীয় , সেখানে কবিতার ক্ষেত্রে সেসব বালাই থাকলোই না ,
সেটা বাঙলা সাহিত্যের জন্যে কতোটা মঙ্গলজনক হলো …সেসব প্রশ্ন গবেষকদের জন্যে তোলা থাক। আমাদের বক্তব্য ছড়ার মত একটা অতিপ্রিয় আঙ্গিকের রক্তহীনতার কারণ অনুসন্ধানেই সীমাবদ্ধ থাক।

ধরাবাঁধা ফরম্যাটে কবিতা লেখা "অনাধুনিক" আখ্যা পেলো।  আন্তর্জালে যা খুশী লিখে তাকে কবিতা নাম দিয়ে চালানোর বিপদজনক প্রবণতা দেখা দিলো।পোস্ট মডার্ণ পোয়েট্রির মত একটা বস্তাপচা থিওরিকে নিয়ে নাচানাচি শুরু হোলো। দেখা দিল বিভিন্ন স্বপ্রকরণ ,

আর ঠিক এই মোড়ে'ই লুকিয়ে আছে ছড়ার পেছনে লুপ্তপ্রায় প্রজাতির স্ট্যাম্প পড়ে যাওয়ার কারণগুলো।ছড়া লিখতে গেলে ছন্দের হাত প্রচন্ড প্রখর হতে হবে। থাকতে হবে মাত্রাবোধ এবং উচিত পরিমাণে রসবোধও। কাদের জন্যে লিখছি সেই টার্গেট রিডারদের মত করেই যত্ন করে সাজাতে হবে আপাদমস্তক। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ালো এই - অধিকাংশ কবিকুল যখন কবিতার নামে যথেচ্ছ ছড়ানোতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন , তখন তাদের পক্ষে ছড়া'র মত একটা ট্র্যাডিশনাল এবং ওভার সেনসিটিভ সাহিত্যের ধারার সাথে তাল মেলানো প্রায় ডনকে ধরার মতো "নামুমকিন "  হয়ে গেল। বরং অপেক্ষাকৃত সহজতর পদ্য লেখাতে তারা মনোনিবেশ করলেন। সহজতর বলছি কারণ ততদিনে একটা থিওরিও চালু হয়ে গেছে। কবিতার ভাল খারাপ কিছু হয়না। ফলে ডবল রোলে অবতীর্ণ হলেন তথাকথিত কবিরা। তারাই লিখবেন , তারাই পড়বেন , তারাই অন্যদের চেয়ে তারা কিকি কারণে শ্রেষ্ঠ তার লক্ষকোটি যুক্তির অবতারণা করে উদ্গান্ডুমার্কা বৃংহনে কাঁপিয়ে দেবেন আন্তর্জালের সাহিত্যজগত।

এসব আধুনিক গর্ভশ্রাবের মাঝেও কিন্তু শাশ্বত সাহিত্যধারার একটা স্রোত নীরবে প্রবাহিত হয়ে আসছিলোই। তাদের কেউকেউ ছড়ার আঙ্গিকের স্পষ্টতার সাথে বর্তমান যাপনের জটিলতা আর পাওয়া না পাওয়া , প্রতিবাদ ,বঞ্চনা ,আধুনিক মানুষের ক্ষোভ প্রভৃতি টাটকা উপাদানকে মিশিয়ে জন্ম দিলেন এক চমকপ্রদ প্যাকেজের। তার সাথে যুক্ত হোলো বিবিধ আকর্ষণীয় অন্ত্যমিলের এক্সপেরিমেন্টেশন। সুকুমার রায়ের হাতে যে ধারা একটা অভাবনীয় উচ্চতায় উঠেছিল, সেই মুকুটে যুক্ত হোলো আরো কিছু রঙিন পালক।

আশ্চর্য মলম সেই ধুঁকেধুঁকে বেঁচে থাকা ঘরানারই বর্তমান প্রতিনিধি।  বিশুদ্ধ ছড়ার পত্রিকা। তবে শিশুকে ঘুম পাড়ানোর জন্যে তার কানের কাছে গুণগুনানো মায়ের ঘুমপাড়ানি ছড়া নয়। কারণ সমস্ত সমাজই আজ গভীর কোমায় আচ্ছন্ন। আজ প্রয়োজন ঘুমভাঙানী ছড়ার। যে ছড়া অত্যাচারী শাসকের মুখে থুতু হিসেবে গুলির মত ছুটে যাবে , যে ছড়া নিজের বিবেকের পিঠে হিসহিসে কঞ্চির মত রক্তলাল দাগ লেপে দেবে , যে ছড়া কোমাচ্ছন্ন যাপনের কানের পাশে এসে পড়বে বদরাগী অংকস্যারের বিরাশি সিক্কার থাপ্পড়ের মত ,যে ছড়া মার মনে সন্তানের অকারণ অমঙ্গল আশংকার মত গুমড়েগুমড়ে কাঁদবে …

…ছড়াগুলো ছড়িয়ে যায় চাঁদনী রাতের ভ্যান্তারা।
ছড়াগুলো পার হয়ে যায় তেলতেলে পথ আঁতলামোর।
ছড়াগুলো  ছড়ায় লেখে যা দেখছে তার চোখদুটো
ছড়াগুলো  মিথ্যেকথায় কেবল থুতুর পিচকারি
ছড়াগুলো করবে ডীমান্ড শিশুর মতো ছন্দজ্ঞান
ছড়াগুলো খুনীর মত ছিনিয়ে নেবে ঘুম রাতের
ছড়াগুলো স্বাধীনচেতা চুলকাবে না পিঠ কারো
ছড়াগুলো চোরগলিতে পথ আটকাবে, ধমকাবে
ছড়াগুলো চড় কষাবে জ্ঞান ফলালেই দুই গালে
ছড়াগুলো পাপের মত পথ দেবে না নিস্তারের
ছড়াগুলো খামখেয়ালি ইগোর ভারে বন্ধুহীন
ছড়াগুলো বোতাম খুলে দেখতে চাইবে জোর পেশীর
ছড়াগুলো বিপ্লবে বা অষ্টধাতুর আংটিতে
পুরো দেশ পাল্টে দেবে, দুপাশে জুড়ে উন্নয়ন
ছড়াগুলো হ্যাংলা ভীষণ লজ্জাশরম বালাই নেই
ছড়াগুলো রোজ উঁকি দেয় অষ্টাদশীর ডায়রিতে
ছড়াগুলো ন্যাংটো মাতাল দেখনহাসি চক্ষুশূল
ছড়াগুলো ভেংচি কাটে নন্দীগ্রাম আর পার্কস্ট্রীটে
ছড়াগুলো রাজধানী বা ভুলতে থাকা আমলাশোল
ছড়াগুলো হারলে ভারত পাকিস্থানের ফ্ল্যাগ ওড়ায়
ছড়াগুলো মরতে থাকে মিথ্যে আশায় সীমান্তে
ছড়াগুলো বেচবে বলে মায়ের দেহের বায়না নেয়
ছড়াগুলো থমথমে মুখ, কাঁচের চুড়ির ঝনত্কার
ছড়াগুলো বদমেজাজি, ভীষণ গোঁয়ার, উরুম্বা
ছড়াগুলো সুন্দরী তাই অহংকারে নাক উঁচু
কতদিন শেভ করেনি, জ্বলছে হৃদয়, পুড়ছে চোখ
ছড়া গুলো কাটতে পারে হাতের শিরা ব্লেড দিয়ে
ছড়াগুলো কামার্ত তাই প্রেমের ঘ্রাণে বুঁদ শরীর
ছড়াগুলো পলাশ শিমুল কৃষ্ণচূড়া লাল গোলাপ
ছড়াগুলো পোষ না মানা গল্পবেলার কমিউনিস্ট
ছড়াগুলো সাম্প্রদায়িক, অশিক্ষিত, বেলাল্লা
পিছু ফিরে তাকিয়ে দেখা কংগ্রেসী আর যুক্তফ্রন্ট
ছড়াগুলো প্রশ্ন করে কার হাতে সেই রক্তদাগ?
ছড়াগুলো নিক্তি পেতে রিজার্ভেশন মাপছে দ্যাখ
ছড়াগুলো রিক্ত বামুন পৈতে ফেলে ভিখ মাগে
ছড়াগুলো দেশবিরোধী মুন্ডা,কোড়া কিস্কু লেট
ছড়াগুলো চাইছে পাহাড়, অস্ত্র হাতে মাওবাদী
ছড়াগুলো পর্নগ্রাফি শিখতে গেছে ইস্কুলে
ছড়াগুলো ঐতিহাসিক, রাষ্টপিতার সেফটি ভাল্ব
ছড়াগুলো খুঁজছে কারণ মরলো কেন সুভাষ বোস?
ছড়াগুলো মেয়ের লাশে চাকরি পাওয়া মেয়ের বাপ
গুজরাটে  পথের ধারে সঙিন ফোঁড়ে শিশুর ভ্রুণ
ছড়াগুলো বাঁচতে পারে ভাতের বদল লাথ খেয়েও
ছড়াগুলো কিসের ফারাক, মমতা কিংবা বুদ্ধদেব
ছড়াগুলো লঙ্কা গেলে রাবন সাজে সব শালা
ছড়াগুলো মহাভারত, জ্বলতে থাকা নারীর চোখ
ছড়াগুলো হাসান হোসেন মরতে থাকে কারবালায়

ছড়াগুলো গ্রীষ্মকালীন নিমবেগুন আর পাটের শাক
ছড়াগুলো কবিতা নয় এসব সমেত  ছড়াই থাক।

আজ আমাদের এইসব ছড়ার প্রয়োজন। তাহলে আসুন। এতদিনে অনেক গোছানো হয়েছে। এবার ছড়ায় একটু ছড়ান না ,  ক্ষতি কি …?

No comments:

Post a Comment