Pages

Wednesday, 25 June 2014

বীরভূমের প্রবাদ প্রবচন ও কিছু অসংলগ্ন কথাবার্তা

প্রবাদ প্রবচন কি মেয়েদের তৈরী? 

বীরভূমের প্রচলিত প্রবাদ প্রবচন নিয়ে খানিকটা দৌড়ঝাঁপ করার পর এই কথাটাই আগে আমার মাথায় এলো। কেন এলো , সেটাও বলছি। তবে আগে সো কল্ড "শ্লীল" লোকজনদের বলব এই পোস্ট থেকে দূরে থাকতে। কারণ শ্লীলতা'র মত আপেক্ষিক বস্তু  আর যায় হোক ভাষার বিবর্তনে কোন সাহায্য তো করেই না বরং বিস্তর প্রতিকূলতার সৃষ্টি করে। আর এই প্রবাদ প্রবচনগুলো যে যুগে জন্ম নিয়েছে , তখন ভাষার শ্লীলতাহানি নিয়ে সমাজ এতটা শুচিবাইগ্রস্ত ছিল না।

যে দুটো কথা বল্লাম;  সেগুলো যে আমার স্বকপোলকল্পিত নয় তারজন্য কয়েকটি উদাহারণই যথেষ্ট …

"অগত্যায় লাতি ভাতার।"
আক্ষরিক অর্থে অগত্যায় পড়ে নিজের দৌহিত্রকেই ভাতার( সংস্কৃত ভর্তাথেকে আগত , যার অর্থ স্বামী বা মালিক) রুপে স্বীকার করে নেওয়া। তবে পরোক্ষভাবে
প্রবাদটি নারীপুরুষনির্বিশেষে একজন ব্যক্তির চরম অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়ে হীনতর কোন কর্মে লিপ্ত হওয়াকেই বোঝায়। লক্ষ্য করুন ,  পরোক্ষভাবে যদিও প্রবচনটি নারীপুরুষনির্বিশেষে সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য কিন্তু এর প্রত্যক্ষ বা আক্ষরিক অর্থ কিন্তু নারীর দিকেই ইশারা করছে।

এরম আরো অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেখানে এই "ভাতার" শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন ধরুন ," যে দুখ কে সেই দুখ , (আমার) ভাতার ধরি কি সুখ! '' কিংবা "নাং (প্রেমিক ) এর আশায় ভাতার মারি"  ইত্যাদি ইত্যাদি। কোথাও নারীর অসহায়ত্ব , কোথাও অনুশোচনা , কোথাও নিজেকেই বিদ্রুপ করা , কোথাও আবার এক নারীর প্রতি অন্য নারীর নির্ভেজাল কটুক্তি।
যেমন ধরা যাক "এক পয়সার তেঁতুলবিচি , পোঁদ করছে খিচিবিচি। " অর্থাৎ আকস্মিক ধনলাভের পর আত্মঅহঙ্কারপ্রসুত অস্বাভাবিক আচরণ। একই অর্থবহনকারী একটি বহুপ্রচলিত প্রবাদও আমাদের সো কল্ড শ্লীল সমাজে প্রচলিত আছে। "নির্ধনের ধন হলে দিনে দেখে তারা।"

আর নারীর প্রতি নারীর বিশেষ করে বৌ শ্বাশুড়ী বা ননদ বৌদি/বৌমা'র চিরাচরিত বিদ্বেষের কথা তো সর্বজনবিদিত। আর সেই বিদ্বেষের গর্ভেই জন্ম নিয়েছে না জানি কত এইজাতীয় ধনরাশি!
বৌমাকে ঠাট্টা করে শ্বাশুড়ীর বাক্যবাণ " পোঁদে নাই ইন্দি(জল) ভজো রে গোবিন্দি ,অথবা  "বাবার জন্মে নাইকো গাই ,
চালুন নিং দুহাতে যায়!' ,  কিংবা " কত কি হয় সাধে , পিদিম জ্বেলি পাদে! " , কিংবা "সেই তো মল খসালি , তবে কেন হাসালি!" ইত্যাদিইত্যাদি।
কিংবা বৌয়ের বাপের বাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থাকে ব্যঙ্গ করে "হাঘরের বিটি রে ভাতঘরে পোলো(পড়লো) একথাল ভাত দেখি নেচিকুদি মোলো!" , কিংবা জনৈক "পদী " নাম্নী কিশোরী বধু'র রন্ধনজনিত অক্ষমতাকে বিদ্রুপ কর "কত রঙ্গ দেখালি পদী , অম্বলে দিলি আদা!"
তা যে যায় বলুন না কেন, এইসব প্রবাদ প্রবচনের গর্ভেই তত্‍কালীন সমাজে পণপ্রথা ও ততজনিত কারণে নববধূকে যে দূর্ভোগ পোয়াতে হতো , তা এইসব প্রবাদ প্রবচনের মধ্যেই স্পষ্ট।  অবশ্য সেই পরিস্থিতি যে এখনও খুব একটা উন্নতি হয়েছে তা কিন্তু নয়। কার
ণসেই ঐতিহ্য মেনে এখনও " অম্বলে আদা " দেওয়ার মত ঘটনার জন্যে নববধূকে মানসিক নির্যাতন এমন কি কিছুকিছুক্ষেত্রে শারীরিক উত্‍পীড়নও সহ্য করতে হয়।

অবশ্য তত্‍কালীন বধূরাও যে বৃদ্ধা শ্বাশুড়ীকে কিংবা বয়স্ক ননদকে পাল্টা দিতেন না এমন নয়। তাদের বাক্যবাণও তীক্ষ্ণতা বা রসঘনতার দিক থেকে খুব একটা পিছিয়ে ছিল না।
প্রথমেই উল্লেখ করা "যে দুখ কে সেই দুখ, (আমার ) ভাতার ধরি কি সুখ?" কিংবা শ্বাশুড়ীকে শুনিয়ে শুনিয়ে সমবয়সী প্রতিবেশিনীকে নিজের অবস্থার এইভাবে বর্ণনা দেওয়া " যে আমার বিহ্যা(বিয়ে) তার দুপায়ে আলতা!"
কিংবা "শ্বশুরবাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থা আর তারজন্যে নিজের কষ্টভোগ'কে তুলে ধরার জন্যে "দূর থেকি শুনল্যাম জগঝম্প বাজনা , কাছে এসি দেখল্যাম লাঠি আর লাদনা!"

এ তো গেল " ফর ওউমেন বাই ঔমেন " টাইপের সরলীকরণ।তাছাড়াও বহু বিষয়ে বহু প্রবচন বীরভূম তথা বাঙলার কোল আলো করে আছে। তাদের কোনোটাই অভিজ্ঞতা থেকে লব্ধ সাদারণ জ্ঞান , কোনোটাই নিছকই এক সম্প্রদায়ের অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ, কোনোটা আবার ভীষণ ব্যতিক্রমী।
যেমন ধরুন

"কালো বামুন, কটা মাল, কয়রাচোখ্যা মুসলমান
ঘরজামাই আর পোষ্যপুত্র সব শালা সমান"
এইসব প্রবাদ যদিও একটা নির্দিষ্ট একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রচিত , এবং এর সত্যতা নিয়েও রীতিমতন সন্দেহ আছে কিন্তু একই সাথে এখন কোথাও কোথাও যে একে বেদবাক্যের মত মনে করা হয় এটাও সত্য। নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বদগুণের উল্লেখ করে আরো অজস্র প্রবাদ প্রবচন রচনা করা হয়েছিল , যাদের মধ্যে -
           " মুখুটি কুটিল বড় , বন্দ্যঘটী সাদা
              আর চট্ট হারামজাদা"
কিংবা -
                   "তেঁতুল হয়না মিষ্টি
                     নেড়ে হয়না ইষ্টি।"
কিংবা -
                   "পুরুষের ভালোবাসা
                    মুসলমানের মুরগি পোষা।"

এরকম আরো অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। এত গেল একে অপরকে কটুক্তি করে রচিত প্রবচনগুচ্ছ। এবার যে ব্যাপারটা আলোচনা করব সেটাই আমাকে সবচেয়ে বেশী চমকে দিয়েছে। তত্‍কালীল মানুষ ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলেন এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু যদি দেখেন কর্মক্ষমতায় বিশ্বাসী  মানুষ তখনও ঈশ্বরকে হয়ত একেবারে উড়িয়ে দিতে পারেন নি , কিন্তু তাকে যে বিশেষ পাত্তা দিতেন না সেটা স্পষ্ট। নাহলে এরকম প্রবচন রচিতই বা হলো কিভাবে?
      "হে নারায়ণ , তরাও তরাও(ত্বরাও ত্বরাও)
        হাত পা লড়াও, হাত পা লড়াও(নড়াও)

অর্থাৎ ঈশ্বরের কাছে যখন বলছি -হে ঈশ্বর, আমাকে এই সংসারসমুদ্র পার করো। ঈশ্বর বলছেন
- দিব্যি তো হাত পাওয়ালা লোক হে তুমি। হাত পা নড়াও। নিজে চেষ্টা করে পার হও, বাপু, আমি ওসব ক্যাচালের মধ্যে নেই।

"হরি বলো মন রসনা, খেঁজুরগাছে পোঁদ ঘোঁষো না
ঘষতেঘষতে বেরোবে রক্ত , তবে জানব তুমি হরিভক্ত। "

                                         …চলবে …

Tuesday, 24 June 2014

কাশ্মিরী কম্বল ও নবুজ্যেঠুর স্পষ্টবাদিতা

নিশিকাকিমার মেয়ে শিউলিকে দেখতে এসেছে সাঁইথিয়ার এক পার্টি। কাকিমা সহায়সম্বলহীন বিধবা। কাজেকাজেই সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়েছিল পাড়ার ছেলেমেয়ে মানে আমাদের ঘাড়েই। প্রতিবেশী নবুজ্যেঠুদের ঘর থেকে সুদৃশ্য কাশ্মিরি কম্বল এনে বড় ঘরটায় পেতে দেওয়া, একটা টেবিল ফ্যানের ব্যবস্থা করা, মহাদেব মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে টুকটাক কেনাকাটা , কনে সাজানো, এমন কি যে জানালার পাশে বসে কনে দেখানো হবে তার বাইরে থেকে কনে দেখা আলোর জন্যে সূর্যের আলোর অভাবে অল্টারনেটিভ আলোর ব্যবস্থা করা , মানে এ টু যেড সবই আমাদের দায়িত্ব, আর কি।

পাত্রপক্ষ বলতে বছর চল্লিশের এক নাদুসনুদুস ভদ্রলোক, আর তার চেয়েও বেশী নাদুসনুদুস গোটা তিনেক বন্ধু।গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে তাদের পা-ধোওয়ার জন্যে জল দেওয়া হলো। খানিক পরেই ছিমলি গিয়ে ওদের সামনে কোল্ড ড্রিঙ্কস , তারপর পরম্পরা মেনে মিষ্টিসিঙ্গারানিমকি সুসজ্জিত প্লেট নামিয়ে দিয়ে এলো। ওদিকে পাশের ছোট ঘরটাতে তখন শিউলিকে ভদ্রস্থ করে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মিনুবৌদি।
পাড়ার গুরুজনরা মানে ঠাকুমা কাকা কাকিমা বৌদি মিলে প্রায় আট দশ জনের টীম বাইরের বারান্দায় বসে ফিসফিস করছেন। বাপি'দা বরাবরই একটু বেশী স্মার্ট। একফাঁকে কখন স্যাট করে ঘরে ঢুকে পাত্রপক্ষের সামনে এক প্যাকেট উইলস ফ্লেক্ সিগারেট আর মৌরি নামিয়ে দিয়ে চলে এসেছে।

ঠিক তখনই নবুজ্যেঠু এলেন। এই ভদ্রলোককে জেঠ্যু বলা নিয়ে যদিও আমি একটু কনফিউজড তবুও কিন্তু জেঠ্যুই বলি। শুধু আমি কেন , বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনিও জ্যেঠু বলতেন। বয়স আশি নব্বই হবে। একশ দেড়শ হওয়াও বিচিত্র নয়!  তবে বয়সের পক্ষে যথেষ্ঠ মজবুত। লাঠি নিয়ে একটু কুঁজো হয়ে হাঁটেন বটে কিন্তু এখনও চশমা নেন নি। কন্ঠস্বরেও বার্ধক্যজনিত কোন বিকৃতি নেই। ছেলেপুলে নেই , স্ত্রীও বেশ কয়েকবছর আগেই ধরাধামের মায়া কাটিয়ে বেশ ধুমধাম করেই চলে গেছেন। নবুজ্যেঠুই কেবল পঞ্চাশ ষাট বিঘে জমিজমা আর মহেঞ্জোদারো মার্কা একটি পাকা দালান নিয়ে প্রতিবেশীদের হিংসের মুখে ছাই দিয়ে ঠুকঠুক করে ব্যাটিং করে যাচ্ছেন তো যাচ্ছেনই।
তবে হ্যাঁ , জ্যেঠু কিন্তু লোক মন্দ নন। মানুষের পাশে দাঁড়ানো , সত্‍ পরামর্শ দেওয়া ,এমন কি প্রয়োজনে নিজের মরাই ভেঙে ধানচাল দিতেও কার্পণ্য করেন না বলে শুনেছি।
দোষ বলতে ওই মুখের উপর  আনখাই রকমের স্পষ্ট কথা বলা। তবে সেই স্পষ্টকথা যে কি চিজ তা আমরা সেদিন আবার নতুন করে টের পেলাম।

বসার ঘরে পাত্রপক্ষের সদস্যরা কেউ তখন মিষ্টির প্লেটে নিমগ্ন , কেউ আবার সেই প্রাথমিক স্টেজ পার হয়ে মৌরি চিবুতেচিবুতে জুত্‍ করে সিগারেট ধরিয়েছে। 

নবুজ্যেঠু এসেই আলেকজান্ডারের মত ধাঁ করে পাত্রপক্ষ যে ঘরে বসেছিল সেই ঘরে ঢুকে গেলেন। অন্য কেউ হলে একটা গলা খাঁকারি মেরে সেখান থেকে কেটে পড়তো। কিন্তু এসব বাহুল্য নবুজ্যেঠুর নেই। ঘরে ঢুকেই স্যাট করে একটা একটা চেয়ার টেনে নিয়েই মারকুটে সারদা পন্ডিতের মত মুখ করে জ্যেঠু জিজ্ঞেস করলেন
-তা বাবা'দের মধ্যে পাত্র কোনজন?
-এই যে সার, আমি , পাত্রের নিরাসক্ত উত্তর।
-তা বাবাজীবনের নাম কি?
গন্ডেপিন্ডে মিষ্টি গিলে মুখ টকটক লাগছে পাত্রের। সিগারেটে দুটো টান মারার জন্যে ভিতরটা ছটফট করছে কিন্তু নেহাত্‍ই সামনে এই বুড়ো বসে আছে বলে ধরাতে পারছে না।  তার উপর আবার দারোগার মত এনকোয়ারি ,
-সাধন , সাধন দত্ত , মুখে পচা বাদাম পড়ার বিরক্তি নিয়ে উত্তর দিলেন পাত্র।

বামপাশে এক বন্ধু অবশ্য একটু আগেই সিগারেট জ্বালিয়ে ফেলেছে , এখন সেই ধোঁয়া লুকানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টায় ম্যাজিসিয়ানদের মত করে অদ্ভুতভাবে হাত নাড়াচ্ছে। অথচ এই ত্যাঁদড় গাঁইয়া বুড়ো সামনে থেকে নড়বার লক্ষণই দেখাচ্ছে না।
-তা বলি , বাবা'র বয়স কত? - আবার প্রশ্ন? উফফফ!  এ
শালা তো দেখছি জ্বালিয়ে মারলে!  অশিক্ষিত গ্রাম্য বুড়োকে একটু সমঝে দেওয়ার জন্যে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে বিবেকানন্দের মত কেত্‍ মেরে সাধনবাবু চোস্ত ইংরেজিতে বললেন - থার্টি প্লাস।
কথাটা বলেই মনেমনে একচোট হেসে নিল সাধনবাবু। শালা  বুড়ো ভাম এবার একটু চুপ মারবে! আর যায় হোক এই ইংরেজি বুকনির জবাব এই গেঁয়ো বুড়োর কাছে থাকবে না নিশ্চয়।

-কতো প্লাস , বাবাজীবন?
নবুজ্যেঠুর কন্ঠস্বরে শার্লক হোমসের অনুসন্ধিৎসা। 
এতক্ষণ যে আত্মপ্রসাদের সাগরে ডুবকি দিয়েছিলেন সাধন , সেখান থেকে এক ধাক্কায় কে যেন তাকে বাস্তবের চোরাবালিতে আছড়ে ফেলে দিলো। হাঁকপাঁক করে বললো - অ্যাঁ! আ আ মাকে ক-ক-কি- কিছু বলছেন?
-হ্যাঁ মানে জিজ্ঞেস করছি থার্টির সঙ্গে কত প্লাস দেবো, বাবা?
চাতরা গনেশলাল বিদ্যামন্দির থেকে তাদের ব্যাচের একমাত্র আই.এ পাস করা নবুজ্যেঠুর কন্ঠস্বর শোয়েব আকতারের ইয়র্কারের মত সোওওজা এসে আছড়ে পড়ল।

ঘরের মধ্যে শ্মশানের নীরবতা। সপারিষদ সাধনবাবু বুঝে উঠতে পারছিলেন না এই প্রশ্নে তার রেগে যাওয়া উচিত্‍ নাকি হেসে ফেলা , নাকি শেষমেষ কেঁদেই ফেলবেন!
হঠাৎ "কোঁত্‍খরকফরাত্‍ " বা ওই জাতীয় কটা আওয়াজে নিস্তব্ধতা ভাঙলো। এই অভাবনীয় পরিস্থিতিতে গলায় সিগারেটের ধোঁয়া আটকে বন্ধুর চোখমুখ দাঁড়িয়ে গেছে। কাশতেকাশতে চোখ থেকে জল ঝরতে শুরু করেছে। থতমত খেয়ে বন্ধু যেই সিগারেটটা নিচে গুঁজে নেভাতে যাবেন , অমনি নবুজ্যেঠুর স্পষ্টবাদিতার ঝোলা থেকে আকস্মিক বজ্রপাতের মত বের হয়ে এল নবতম পাশুপাত্‍ ,
-ওই সিগারেটটার দাম মেরেকেটে তিন চারটাকা তো হবেই , নাকি?  আর আমার এই কাশ্মিরি কম্বলখান
দেখছো , সেবার পোদ্দারদের বড়ছেলে ,মিলিটারিতে কাজ করে , তাকে দিয়েই আনিয়েছিলেন , বুঝলে কিনা , কেনার জন্যে ট্যাঁক থেকে নগদ তিন হাজার খসেছে। একসঙ্গে সিগারেট আর কম্বল দুটোকেই নষ্ট করে কি লাভ, বাপধন? জল খেয়ে  এট্টু সামলে টামলে নাও , তারপর নাহয় …

তারপর কনেদেখার এপিসোডটা আর তেমন জমেনি। হুঁহুঁনানা করতে করতেই মিনিট পনেরোর মধ্যেই শিউলিরানীর ত্রয়োদশতম পরীক্ষা শেষ হয়েছিল। আরেক দফা চা পানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে হনহন করে গাড়ির দিকে হাঁটা দিয়েছিলেন সপারিষদ সাধন দত্ত।

-আমরা বাড়িতে গিয়ে আলোচনা করি , তারপর ফোন করে জানাবো, গাঁইগুঁই করতেকরতে গাড়িতে উঠে যাওয়ার আগে এটাই ছিল থার্টি প্লাস সাধন দত্তের পার্টিং ওয়ার্ড।

তবে সে ফোন যে আর কখনোই আসেনি সেটা বলাই বাহুল্য!

#পীযূষ কান্তি বন্দ্যোপাধ্যায়

Sunday, 22 June 2014

ভাটকথা - তিন(বায়সের মোক্ষলাভ)

কহিলাম -প্রভু ,মনো:কষ্টে আছি।শয়নে স্বপনে জাগরণে আমার চতুর্পার্শ্বে বিল্ব-দর্শন হইতেছে। ইহা কি সামান্য নাকি অস্বাভাবিক ব্যাধি,জানিতে ইচ্ছুক। দয়া করিয়া অধমের এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জ্ঞানার্জনের ইচ্ছাকে তৃপ্ত করিয়া বাধিত করিবেন।

গুরু কহিলেন -"ওরে ব্যাটা পাঁঠা ,বাংলা বলতে কি পোঁদ ফাটে? কতোবার না তোকে বলেছি,আমার সামনে ভাষা মাড়াবি না ,তা তোর কানে তো জন্মগত হাইড্রো! নিজের গোঁ থেকে নট নড়ন নট কিচ্ছু!"

সবিনয়ে স্রাষ্টাঙ্গে গুরুচরণে প্রণিপাত করিয়া নিবেদন করিলাম -ভক্তান্তপ্রাণ,নির্ধনের ধন,আপনি তো জ্ঞাত মহারাজ যে সঙ্গদোষে শতগুণ নাশে। এই অধমেরও সঙ্গদোষে সেইমত সর্বগুণনাশ হইয়াছে।  এখন এইমতে যদি পাতকীকে ত্যাগ করিবেন ,তবে প্রাণান্ত ব্যতীত উপায় দেখিনা।

"সে যাকগে ,তোরা বাঙালীরা তো জন্মগত শুয়ার্। আমার মত ইন্টারন্যাশনাল লোকের ফ্লেক্সিবিলিটি তো তোদের বাপদাদাদেরই ছিলনা। তো তোরা তো কোন ছার ..তা বল ,কি বেল দেখছিস? বড় বেল নাকি কয়েত্‍ বেল?"

আমি কিয়ত্‍ক্ষণ নিরুত্তর রহিলাম ,কারণ শ্রীফলের আকার সম্পকে কিঞ্চিত্‍ সন্দীহান ছিলাম।

শ্রীপাদ গর্জন করিয়া উঠিলেন-"শালা!দেখবি ,দুম করে আধুনিক কবিতা ছুঁড়ে মারবো ,একটা আলাদা হয়ে ড্রেনে পড়ে যাবে। সারাজীবন মাটির গুটুলি পাকিয়ে ভরে রাখতে হবে। তলে ঘাস বেড়িয়ে গেলে দিনরাত ছাগলের তাড়া খেয়ে মরবি।বলি মিষ্টি লেগেছিল ,নাকি  হাল্কা কষা ,হালকা টক?

নিম্নস্থ গোলাকৃতি বস্তু মস্তকের দিকে ধাবিত হইলো।
খড়মের দিকে আড়চোখে দৃষ্টিপাত করিয়া য পলায়তি স জীবতি মন্ত্র আউড়াইতেছি কিন্তু প্রয়োজন হইলোনা।
এইবার অধমকে বলিপূর্ব অসহায় পন্ঠকের ন্যায়  কম্পিত হইতে দেখিয়া গুরু কিঞ্চিত্‍ মৃদুস্বরে কহিলেন-তাও জানিসনে! আহাহা! পোলাপান!
বেশ ,এট্টু ভেবেচিন্তে বল দিকিনি,বেলে আঠা ছিল?"

কহিলাম-স্বাদগ্রহনের সুযোগ উপলব্ধ হয় নাই,মহারাজ।
দিবারাত্রি নয়নসম্মুখে দুলিয়া দুলিয়া ঝুলিয়া থাকে সত্য কিন্তু স্বাদু নাকি বিস্বাদ তাহা বলিতে এ অধম অপারগ।

"কি ঝঞ্ছাট!ইকি অত্যাচার,এখন আন্দাজে কি বিধান দিই,বল ধিনি!তার উপর তোর এই ইয়ের মত ল্যাঙ্গুয়েজ!বলি,কোথায় দেখলি ,কখন দেখলি ,কিছু তো ডিটেলে বলবি নাকি?

সেতো নিত্য দেখি, প্রভু। ফেসবুকস্থ বৃক্ষে ঝুলিয়া থাকে। টি আর পি নামক এক অদৃশ্য মহাজাগতিক শক্তির প্রভাবে প্রভাবিত হইয়া কেহ দৈনিক ,কেহ সপ্তাহান্তে কেহ বা এক পক্ষকাল বাদ গোলাকৃতি হইতে ডিম্বাকার ,আবার ডিম্বাকার হইতে পুনরায় গোলাকৃতি লাভ করে।
তবে চৌকো শ্রীফল দেখিয়াছি কিনা স্মরণ হইতেছে না।

সর্বগুণনিধি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন-"হুম্মম্মম!"
তাহার পশ্চাতে এক বিকটাকার ঝোলা হইতে একটি নিটোল তাম্বাকুর দন্ড বাহির করিয়া,তাহার অগ্র ও পশ্চাতে "ওঁ বিষ্ণু! বলিয়া  অষ্টতরশতবার ফুত্‍কারের শব্দ করিলেন। অতপর "ওঁ চিত্‍পিঙ্গল হনোহনো দহোদহো,পচোপচো সর্বকর্মণে সাধয়ে স্বাহা " বলিয়া তাহাতে অগ্নিসংযোগ করিলেন।আশ্চর্য হইয়া দেখিলাম তাহার মুখ হইতে দাউদাউ করিয়া অগ্নিদেবতা পারিষদসহ বাহির হইয়া আসিতেছেন।
উক্ত কুসুমাস্তীর্ণ আশ্রম তাম্বাকুর ঘ্রাণে ম ম করিতে লাগিল। গুরু স্মৃতমুখে কহিলেন-"তুই তো ক্ষণজন্মা রে,বোকা**!তোকে মাদিমুখো হুতুম ভাবতুম,তালুকদারের ভালুক ভাবতুম ,হনোলুলুর লুলুরাম ভাবতুম ,তা সে তো আমার পাপ হইচে। অপরাধ হইচে। তোর এইসব যা সিন্টম  দেকচি তাতে মোক্ষ বলেই মনে হচ্চে রে।শুদু এট্টু ডাউট হচ্চে এই ভেবে .."

নিশ্চিত দেবত্ব'র বিড়ম্বনা হইতে আচমকা সংশয়ের সম্ভাবনায় বিকশিত হইয়া উঠিলাম।বাক্যবাণ কিংবা  নিখুঁত খড়ম ক্ষেপনের হাত হইতে পরিত্রান পাইবো এই আশা যদিও ছিল না তবুও ..

"মহানির্বাণ ইউজুয়্যালি পঞ্চাশ পঞ্চান্ন বচরের পর আসে ,বুইলি? তুই এই তিরিশের কোঠা পার করেই কিকরে এই মহাসঞ্জীবণী'র সন্ধান পেলি? ভাবতেই আমার রোঁয়া খাড়া হয়ে উঠছে।"

"দ্রাক্ষারুষ্ট প্রভু?এতক্ষণে অপরিচিত বস্তুসকলের উল্লেখে বিমর্ষ হৃদয় পরিচিত শব্দবন্ধের উল্লেখমাত্র চৈনিক দস্যুর মত উত্‍ফুল্ল হইয়া উঠিল।

প্রভু কহিলেন -"দুসশালা!তোদের ভাটের সাইন্স অবশ্যি একে পটাটোম্যানিয়া বা আলুর দোষ বলে কিন্তু ও গাধার বাচ্চারা জানেনা ,এই ক্ষমতা নিয়ে কোনকোন মহাপুরুষ একশো বচরে একদুবার জন্মায়। কেউকেউ আবার কঠোর তপস্যার পর এই সুপ্রিম পাওয়ার লাভ করে। এ ক্ষমতা যত ব্যবহার করবি,তত বাড়বে।মহাজ্ঞানী মহাজন ,যে পথে করে গমন ''শুনিসনি রে বাপ। তুই এক কাজ কর ,একন থেকে জাপানী তেল লাগা আর রামের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চল্।"

জাপানী তৈলের কথা শ্রবণে করা মাত্র তলপেট হইতে দিব্যগুড়্গুড়ি উঠিতে লাগিলো।আশ্চর্য হইয়া দেখিলাম আপাদমস্তক অভুতপূর্ব ভক্তিগুদগুদি অনুভব করিতেছি। ইষত্‍ চিন্তিত হইবার অভিনয় করিয়া গাঢ়বদনে নয়ন অর্ধোন্মিলিত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম-পরন্তু রামের পদাঙ্ক তো বহুপ্রাচীন ,প্রভু
মিলাইয়া যাইবার সম্ভাবনা প্রবল। এমতবস্থায় কি কর্তব্য যদি দয়াপরবশ হইয়া কহিয়া দেন ...

প্রভু আকর্ণবিস্তৃত স্মৃতহাস্যে ভগ্নপ্রায় তালবৃক্ষের  ন্যায় দুলিতেদুলিতে অধমের ছাগশিশুর ন্যায় নধরকান্তি প্রত্যক্ষ করিয়া কহিলেন -"রাম নেই তো কি হয়েছে রে পাগলা? বাপু আশারাম তো আছে।"

পরিপক্ক শ্রীফলের গন্ধে ভারি দক্ষিণা বাতাস ফেসবুকস্থ সমস্ত বৃক্ষের শাখা দুলাইয়া শনশন শব্দে বহিয়া গেল।

দেখিলাম ,আমার  উভয় পার্শ্বে যুগল পক্ষ নির্গত হইতেছে।যারপরনাই ভীত হইয়া গুরুদেবের নাম ধরিয়া ডাকিতে গেলে নিজের বায়সকন্ঠ শুনিয়া নিজেই স্তম্ভিত হইয়া জ্ঞান হারাইলাম।

(বি দ্র:-এক্ষণে ব্যাকগ্রাউন্ডে'ওঁ জয় জগদীশ হরে'বাজিতে থাকিবে)

ভাটকথা- দুই ( হোয়াট অ্যা ফিলদি মিথ)

…আচ্ছা ওসোব আজেবাজে পাজিকথা বাদ দিলাম.এবার কিছু আড়-কথা,সার-কথা,ভাঁড়-কথা বোলি...টকিং? …সাচ এ ওয়েস্ট অফ টাইম,কিন্তু কি করবো,ছিঁড়ে আঁটি বাঁধা ছাড়া কাজও তো নেই

কাজেকাজেই কোবির কথাতেই ফিরি..শিরি শিরিমান কবি যার মেয়ে দেখলেই কোবিতা পায়,কোবিতায় লিখতে লিখতে মেয়ে পায়..আর কিছু  টেকনিক্যাল ফল্টে ,হিসি পাই,শিশি রাখা আছে সেই উদ্দেশ্যেই,
বোতলও,কিন্তু সেটা অন্য কারণে..পেটে বিদেশী

দামী আগুন গেলে চট করে নিজেকে বড় সস্তা করে ফ্যালেন.তখন তার বস্তা থেকে বিকৃতির দল গেরুয়া পরে ফক্সট্রট নাচতে নাচতে এসে ইরেকশন,ইরেকশন করে চেল্লাচেল্লি শুরু করে.
তেরি মা কি আঁখ!!তখন কবির নিজেকে কবিতার চেয়েও বড় বলে মনে হয়,প্রায় ঈশ্বর..স্রষ্টা তিনি,যদিও উর্বর্শী,মেনকা প্রভিতিদের সেক্সচ্যাটে সিডিউস করেও শোয়াতে পারেননি.বড্ড সেয়ানি শালীরা,ইসস!!
ভাগ্যিস…কারো সামনে বলেননি
হঠাত কিসের দিব্বোদিসটি পেয়ে তিনি পষ্ট দেকলেন সোততি সোততি ইস-সর(সর বে!) হয়ে গেলেন.কোবিতা ল্যাখার কলোমটা হঠাত নুনু হয়ে চড়াত করে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে কবিরে কপালে এসে লাগলো.খেয়ালী নুনুর ডগায় লাল কালি মাখিয়ে এখন তিনি সমস্ত অবিশ্বাসী,অশ্লীল,নাস্তিকদের জন্যে একুশে ডিসেম্বরের ধ্বংস লিখবেন.

বাড়ির বাইরে অগনিত ভক্তকুকুর গলবস্ত্র হয়ে জোড়হাত করে দাঁড়িয়ে আছে,যদি একটু কৃপামিশ্রিত মুত্রের ছিটে এসে গায়ে লাগে..
একপা তুলে কিছু উনকবি গাছের বুকে চুনচুন কবিতা লিখছিল,আশা ছিল কবির স্বর্গীয় নুনু দিয়ে কিছু অটোগ্রাফ করে দেবেন.

কবি ঈশ্বর সেজে হেলতে দুলতে বাইরে এলেন.একহাতে আস্তিক্যবাদের কোঁচা অন্যহাতে শ্লীলতার ছুড়ি...
দেখলেন কুকুরের পাল কক্ষণ সিক্সটি-ফাইভ হয়ে গেছে..মন্দিরের চাতালে পরে আছে পোড়াবিড়ির টুকরো,কাগজের ঠোঙ্গা,স্যানিটারি ন্যাপকিনের …

খুঁজছিলেন..কবি কে কবি ঈশ্বর কে ঈশ্বর,কিছু খুঁজছিলেন,নিজেকে ঈশ্বর ভাবা কবি কিছু খুঁজছিলেন,
ধোপদুরস্ত ধুতিপাঞ্জাবি পরা সভ্য শ্লীল সমাজের প্রতিনিধি কিছু খুঁজছিলেন..
পেলেনও,একটুকরো কাগজ,একটুকরো সাদা কাগজ,পুরো সাদা নয় কিছু নীলের ছিটেতে আঁকা কটি কথা.

"স্বর্গীয় নুনুর ডগায় লাল কালি লাগিয়ে
ধ্বংস লিখবেন খেয়ালী ঈশ্বর
গলবস্ত্র হয়ে জোড়হাত পেতে বসে আছি
যদি রক্তমেশানো কৃপা-মুত্রের পাত্তা নেই

এখানে ধ্বংসের পাহাড়ে হাড়গোড়ের
স্তুপে একটাও দধীচিমার্কা নেই

শুধু কিছু অশক্ত বিশ্বাসের ভক্তিবমি
কিছু আস্তিক কুকুরে চাটছে

উচ্ছিষ্টটা তোমার জন্যে তোলা থাকলো ঈশ্বর-বাবু

ধ্বংসের বুকনি ভুলে
এখন নিজের পুনর্মুষিক ভব দেখে
থরথর কাঁপ অস্তিত্বহীন.."

পড়া হলো..এখন কাব্যের ঈশ্বর থরথর করে কাঁপছেন..
হিস্টোরিক রোগীর মত নড়েনড়ে উঠছে তার লক্ষকোটি বছরের পুরানো কাঠামো.গলে গলে পড়ছে কবিতার শাক দিয়ে ঢাকা মাছের শরীর..আঁশটে গন্ধে ভরে যাচ্ছে বাতাস..মিলিয়ে যাচ্ছেন,একটুএকটু করে মিলিয়ে যাচ্ছেন ঈশ্বর,ক্ষয়ে যাচ্ছেন কবি..নুনুর লাল রঙ মিলিয়ে যাচ্ছে মাটিতে…
চারিদিকে শুধু অসংখ্য মাথার সারি.নারী নেই,পুরুষ নেই,ধর্ম নেই,দেশ নেই,জাতি নেই,দামী নেই,পাতি নেই,শ্লীল,অশ্লীল কিচ্ছু নেই.শুধু মাথা আর  মাথা..আর অগনিতচোখ,আনন্দে খুশিতে জ্বলজ্বল করছে..
ক্রমশ ..