‘হাস্যকর তোমার অতীত হাস্যকর তোমার ভবিষ্যৎ...
ঘটনাহীন ঘটনাহীন মস্ত ঘটনাহীন তোমার জীবন
কফির কাপে, মিছেই তুমি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছো তোমার ব্যগ্র চামচ
তোমার মাথার ওপর চিরপুরাতন, সেই এক, পতনোন্মুখ চাঁদ
...এক শুয়োর এই সে দিন তোমাকে অপমান
করেছে, তোমার আত্মা, লম্বা জুতোর চেয়েও আরও লম্বা হয়ে গেছে হঠাৎ
...বছরের প্রথম দিনেও তুমি ঘুরে বেরিয়েছ একা একা
বছরের শেষ দিনেও তাই’
চাহিদা ছিলোই,জীবনানন্দের হাত ধরে যার শুরু পরবর্তীতে ,শক্তি ,শঙ্খ ,বিনয় সুনীল হয়ে, হাংরি আর কৃত্তিবাসের পাড়া ঘুরেঘুরে চলছিল সেই আর্বান য়াঙ্গস্ট বা নাগরিক যাপনের ছত্রেছত্রে লুকিয়ে থাকা অবদমিত ক্রোধ,না পাওয়া,দৈনন্দিন বিশ্বাসভঙ্গ এবং হতাশা ,আর বিকৃতিকে প্রকাশ করার মত উপযুক্ত ভাষার খোঁজও ..
আচমকা এক কূলশীলহীন রাস্তার ছেলের হাত ধরেই এলো সেই উচ্চারণ যা আর্বান জটিল যাপনের মূক অসহায়তাকে বাঙ্ময় করে তুলছিল।
এই ক্ষয়াটে নাগরিক জীবনের অথেনটিক ভাষাতেই ভাস্কর লিখে গেলেন বিষাদফিস্ফোরণের রোজমানচা ,আশার আশাবরী কিংবা নির্লিপ্ততার চুরান্ত মহাকাব্য।
তাই ভাস্করকে ভালোলাগে ,ভালোবাসতে ইচ্ছে করে ,কারণ ভাস্করের কবিতা খুনীর হাসির মত তীক্ষ,হাটুরের পায়েপায়ে মুছে যাওয়া আলপনার মত জীবন্ত,পঞ্চদশীর প্রথম ঋতুস্রাবের মত নিশ্চিত ,গরীব বিধবার পুত্রহারানোর গভীর শোকের মত নির্মম।
যদি সমস্ত ভাষার ইতিহাসের পাঁক ঘেটে দেখি
অনেক বিখ্যাত কবিদেরই পাব যারা আমাদের মনের কথা একেবারে মনের মত করে লিখেছেন। কিন্তু তাদের আলাদা জীবন ছিল। ভাস্কর চক্রবর্তী এখানেই ভিন্ন ,কবিতা দিয়েই গড়ে নিয়েছিলেন নিজের আপাতসাধারণ জীবনকে। পরিচিত হাসিকান্না,পাওয়া না পাওয়া,সাময়িক নির্লিপ্তি আবার কখনো চকিত বিস্ফোরণকে উপজীব্য করে দিনের পর দিন গেঁথে গেছেন কবিতার জাল। জন্মদরিদ্র্য ভাস্করের কাছে কবিতা ধরা দিয়েছিল এক অনোখা মুক্তির আশায়।
কবিতার একটা পংক্তির সাথে অন্য পংক্তির অসীম দুরত্বের মধ্যেও যে এক নিবিড় নৈকট্য লুকিয়ে থাকে ,
ভাব ও ভাষার সহজতর ব্যবহারেও গভীর জীবনবোধকে রিপ্রেজেন্ট করা যায়,অহেতুক ঠেলেঠুলে দর্শনকে না ভরেও বারোয়ারি জীবনের পাতি রুটিনেও যে কবিতার
মালটিডাইমেনশন্যাল উপাদান লুকিয়ে থাকে,এই বিশ্বাসই ভাস্করকে আমার মনের কাছাকাছি এনে দিয়েছে।
আরবান উদাসীনতা, আধুনিকতার মনস্তাত্ত্বিক সংকট ,একাকীত্ববোধ,হোমসিকনেস ,উচ্ছ্বাস, প্রভৃতি বারবার ভাস্করের লেখায় ঘুরেঘুরে এসেছে।
নিজেও স্বীকার করেছিলেন,এই অসীম স্বাধীনতা(অনেকের কাছে যা স্বৈরাচার বলে নিন্দিত)তার লেখায় দাপিয়ে বেড়িয়েছে।
এক আশ্চর্যরকমের ক্যাসিক আবহের মধ্যে
লালিত ভাস্করের কবিতায় প্রায়ই অপ্রত্যাশিত ইমেজকে ব্যবহার করে কোন চেনা একঘেয়ে ঘটনাকে অসাধারণ করে তোলার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়।
নির্দিষ্ট কোন বিষয় না খুঁজে যেকোন বিষয়বস্তুকে কবিতা করে তোলার মুনশিয়ানা তার ছিল।
তার সাথে ছিল শুচিবাইহীন শব্দপ্রয়োগের অসাধারণ দক্ষতা ,আর ঠিক এই কারণেই তার অনায়াস শব্দপ্রক্ষেপ আমাদের মুগ্ধ করে।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে 'শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা'নামক কাব্যগ্রন্থের হাত ধরেই ভাস্করের পথ চলা শুরু। তারপর 'এসো সুসংবাদ এসো'র হয়ে যাত্রা চলতে থাকে ২০০৫ পর্যন্ত ,
আপাদমস্তক মুক্তমনের মানুষ ভাস্কর দ্বিধাহীন ভাবে বলতে পারেন-'ঈশ্বর আমি বোঝাতে পারিনি,মন্দিরে থুতু ছিটিয়ে দিলেও মানুষের কিছুমাত্র ক্ষতি হয়না'
কি সত্য আর সাহসী উচ্চারণ! ভাস্কর পড়ে এই ঘটনার সত্যতা যাচাই করার প্রয়াস আমি স্বচক্ষে দেখেছি।
মৃত্যচেতনা এবং এবং পলায়নবাদের বাড়াবাড়িরকমের প্রভাব ভাস্কর সমসাময়িক অনেক কবিদের মধ্যেই দেখা যায়। কিন্তু মৃত্যুকে এত তুচ্ছ করে,সেই ভয়াল,বিমূর্ত সিংহাসন থেকে টেনে নামিয়ে আনার কৃতিত্বও ভাস্করেরই। যেহেতু মৃত্যু নিশ্চিত,তাই তার জন্যে অনন্ত অপেক্ষা করে থাকার নিয়তি কিংবা তার সর্বগ্রাসীরূপ নয়,বরং ভাস্করের কাছে মৃত্যু ছিল ছেলেখেলার বিষয় মাত্র। আর এস্কেপিজম নয় বরং ঘষা রঙচটা জীবনের কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়াই ছিল তার সাময়িক মুক্তির উপায়। এই ভিন্নতা,এই এক্সট্রাঅর্ডিনারী জীবনবোধের উন্মেষই ভাস্করকে প্রিয় প্রিয়তর হয়ে প্রিয়তম করে তুলেছে।
প্রতি সন্ধ্যায় /কে যেন ইয়ার্কি করে ব্যাঙের রক্ত /ঢুকিয়ে দেয় আমার ভিতরে -আমি চুপ করে বসে থাকি -অন্ধকারে ' কিংবা 'জিভ দিয়ে ছুঁয়ে দেখেছি মৃত্যু '
'পোস্টমাস্টারের মেয়ে শুধুমাত্র জুতোজোড়া নিয়ে
বাড়ি থেকে চলে গেছে/তার সঙ্গে গোলাপী যুবক -তারা স্বর্গে যাবে/আমাদের স্বর্গ নেই স্যারিডন আছে।
জৈবিক চাহিদা ,মরণ এবং মরণের হাত থেকে পরিত্রান পাওয়ার এই জাতীয় হাইবারনেশন পাঠকদের মজ্জার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন বলেই ভাস্কর আজও মনের মনিকোঠায় অম্লান।
সন্দেহ নেই ভাস্করের জীবন ছিল কোলকাতা কেন্দ্রিক। সুতরাং এই আর্বান লাইফের বাইরে যে বৃহত্তর জীবন সেটা তার লেখায় তেমনভাবে উঠে আসেনি। কিন্তু এই খামতি ঢেকে দিয়েছে তার অপার তন্ময়তা।
পথঘাট,গলি ,পার্ক ,সমস্তকিছুর সঙ্গে তাঁর একটা আত্মিক টান তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
এই আপাতনিরীহ পথে ধারেও যে এক অসীম রহস্য ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে,সেই চিরঅসহায়,মূক কিন্তু চিরন্তন সত্যের কথালিখে রাখাটাই যেন তার কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।প্রত্যেকটি ক্লীবলিঙ্গও যেন তার সাথে সেই একই নিমগ্নতার সাথে ভাবনার চিতায় শুয়েছিল।তাঁর 'জীবন-সংক্রান্তি' কবিতায় '
'আমি শুধু ঘুরি, আর/ ঘুরে মরি/চেয়ে দেখি, আমার জীবনে শুধু রাস্তা পরে আছে- ধু-ধু-রাস্তা পড়ে আছে শুধু।
কিংবা '' ট্রাম থেকে নামতে-নামতে আমি বুড়ো হয়ে গেলাম কলকাতায়/ আমার জীবন, আমি কার্পেটের মত কলকাতায় বিছিয়ে দিয়েছি।
সুখ নয় বরং এক অনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রনায় আধুনিক মানুষের নিত্যসঙ্গী ,তারই ফাঁকেফাঁকে আসে প্রেম,বিশ্বাস ,বিশ্বাসভংগ ,মায়া ও মমতার মত ছোট্ট কর্ডলাইনের স্টেশন। তাই ব্যক্তিগত সুখে নয় বরং স্পর্শকাতরতায় ভাস্করকে বেশী করে চেনা লাগে।
মনে হয়,আমার দেখা,আমার দেখানোর মধ্যেই ভাস্কর লুকিয়ে আছে।
'রান্নাঘরের দরজা থেকে আমাদের নাটকের শুরু, নাটকের/প্রধান প্রধান চরিত্রের, যথাক্রমে-খিদে,/বুক ব্যাথা, নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, ভয়, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি ইত্যাদি।/ নিঃসঙ্গতা শুধু মিলিয়ে যেতে যেতে মুছে দিচ্ছে আমাদের চোখের জল।
কিংবা ....
সুন্দর একটা জীবনের ইঞ্চিখানেক পাশ দিয়েই/ চলে গেলাম হয়তো/ খুব জোর আর ১৭ মিনিট।
কিংবা -'সারাজীবন গরম একটা কড়াইএর উপর নেচে গেলাম '
এইযে আপাতসরল কিন্তু বাস্তবজীবনের ভয়াল,ভয়ংকরতম রূপটির পরিচয়বহনকারী অমোঘ সত্য উচ্চারণ ,একে ভালো না বেসে এড়িয়ে যাব কি করে?
সময় বদলাচ্ছে দ্রুত ,পরিস্থিত পরিবর্তিত হচ্ছেনা।সেই মৌলিক প্রশ্ন আবার জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন পড়েছে .."ওগো বেঁচে আছিকি ,বেঁচে আছি তো????????
No comments:
Post a Comment